রাজশাহীর আমের অমিয় কথকতা

106
Smiley face

আমের অমিয় কথকতা 🥭

দেশী ফল বেশী বল।|
কথাটা কে বলেছে, তার নাম ইতিহাসে খচিত নাই।| কিন্তু জগৎসংসারে টিকে থাকবার জন্য বলের যে জরুরত তা নিয়ে কারো সন্দেহ নাই।| আর আমের বল সেতো সর্বজনবিদিত।|

আমাদের বাগানে আবার আম এসেছে।| সেই আমের কী মনোলোভা নাম।| তোতাপুরি, দুধসর ও আরাজান।|

যথারীতি সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষারা।| তারা পরম যত্নে গড়ে বাগান।|

আম (Mangifera Indica)🥭 এতদাঞ্চলের সবচে’ সুস্বাদু ফল।| ইংরেজিতে Mango শব্দটি সম্ভবত তামিল ‘ম্যানকেই’ কিংবা তামিল ‘মানগা’ শব্দ থেকে এসেছে।| এমনটাই মত ফল বিশারদদের।|

যখন পর্তুগিজ ব্যবসায়ীরা দক্ষিণ ভারতে বসতি স্থাপন করে, তারা নাম হিসেবে ‘ম্যাংগা’ শব্দটি গ্রহণ করে।| আর ব্রিটিশরা যখন ১৫শ এবং ১৬শ শতকের দিকে ভারতে দক্ষিণাঞ্চলের সাথে ব্যবসা শুরু করে, তখন ‘ম্যাঙ্গো’ শব্দটির জন্ম।|

৫ হাজার বছর আগে হিমালয়ের পাদদেশে আম চাষের ইতিহাস জানা যায়।| তার আগের মানুষ আম খেত কিনা এমন খবর লিপিবদ্ধ নাই।| বিশ্বের মোট আম উৎপাদনের ৪০ ভাগ আম ভারতে জন্মে।| তার বেশিরভাগই আবার সেখানকার মানুষেরই মন জোগায়।|

যদিও পাকিস্তান, ভারত আর ফিলিপাইনের জাতীয় ফল আম।| তবু এটা বলা যায় ফলটি একান্তই আমাদের ভূমিসঞ্জাত।| খুব স্বাভাবিকভাবেই আম গাছ আমাদের জাতীয় বৃক্ষ।|

কৃষিবিদ মৃত্যুঞ্জয় রায়ের মতে, বাংলাদেশে যত রকমের আম হয়, কারও প‌ক্ষেই তার সব চেনা সম্ভব নয়।| এ দেশে একসময় দেশি জাতের প্রচুর আম ছিল।| গবেষকেরা ভারতীয় উপমহাদেশে আমের প্রায় ১ হাজার ৬৫০টি জাতের একটা তালিকা তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়।| এ দেশে আমের সেই বৈচিত্র্যভরা ভুবনে এখনো রয়েছে হাজারখানেক জাতের আম।| ঢাকায় ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় ফল প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছিল আমের ৭৫টি জাত।| প্রতিটি জাতের আমের চেহারা, রং, রূপ, ঘ্রাণ, স্বাদ, মিষ্টতা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য ছিল আলাদা।|

এখনো চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় গেলে অনেক স্থানীয় জাতের আমের দেখা পাওয়া যায়।| ভোলাহাট ও গোমস্তাপুরেও আছে অনেক জাতের দেশি আম।| ক্ষীরভোগ, মোহনভোগ, রাজভোগ, রানিভোগ, রানিপছন্দ, সিন্দুরা, সুবর্ণরেখা, কুয়াপাহাড়ি, নাক ফজলি, ফজলি, চিনি ফজলি, সুরমাই ফজলি, চিনি মিছরি, জগৎমোহিনী, রাখালভোগ, রাঙ্গাগুড়ি, গোবিন্দভোগ, #তোতাপুরি, মিশ্রিকান্ত, জালিবান্ধা, বোম্বাই, ভুতো বোম্বাই, পাহাড়িয়া, গোলাপখাস, কাকাতুয়া, দাদভোগ, চম্পা, সূর্যপুরি, কাঁচামিঠা, কলামোচা, শীতলপাটি, লক্ষ্মণভোগ, গোলাপবাস, কিষাণভোগ, বান্দিগুড়ি, কুয়াপাহারী, রাংগোয়াই, আশ্বিনা, ভাদুরিগুটি, #বনখাসা_বউ_ফুসলানি, ক্ষীরমন, #দুধসর, রঙভিলা, পারিজা, আনোয়ারা, দিলশাদ, আম্রপালি, মল্লিকা, বেগমবাহার, পূজারিভোগ, পলকপুরি, রাজলক্ষ্মী, দুধকুমারী, শ্যামলতা, খাট্টাশে, জাওনা, দমমিছরি, মিছরি মালা, মিছরিবসন্ত, মেসোভুলানী, আনোয়ারা, ফুনিয়া, গোলাপবাস, বাতাসাভোগ, ইটাকালি, গোল্লাছুট, পোল্লাদাগী, মোহনবাঁশি, পরানভোগ, বিড়া, ভারতী, বাদশাপছন্দ, বেগমপছন্দ, রাজাপছন্দ, বনখাসা, বাগানপল্লি, কালিগুটি, পাকচারা, কালিয়াভোগ, কোহিতুর, কালিগুলি, হাঁড়িভাঙা, বালিশা ইত্যাদি জাতের আম এখনো দেখা যায়।| এছাড়া বিদেশি জাতের ব্রুনাই কিং, কাটিমন, বোম্বাই ফজলি, সূর্য ডিমও পর্যাপ্ত পাওয়া যায়।|

বালকবেলায় আমাদের বাড়িতেও হরেকজাতের আম ছিল।| গুটুরি, গিলা, নড়ি, কালো, সিন্দুরিয়া, আষাঢ়িয়া, মধ্যের গাছ, চুইন্না ইত্যাদি।|

আরৎআমাদের এখনকার বাসায় যে গাছের আম সবচে’ সুমিষ্ট ও দেখতে লালিমাময় সুন্দর ছিল।| সেই আমের নাম রেখেছিলাম আমরা ‘রূপসুধা’।| আমাদের ক্ষমার অযোগ্য নির্মমতায় গাছটি এখন আর আমাদের আঙিনায় নেই।|

আমের উপকারিতা কী?।| করোনা পেনডামিককালে এর উপযোগিতাই বা কী?।|
এক কাপ আমে থাকে ৬০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, যুক্তরাজ্যে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস-এর প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯ থেকে ৬৪ বছরের পূর্ণবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৪০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি প্রয়োজন, আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত খাদ্যতালিকায় যা ৬০ মিলিগ্রাম।|

আমে রয়েছে ২০টি ভিন্ন ভিন্ন ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থ, যার মধ্যে অধিক পরিমাণে ভিটামিন এ, পটাশিয়াম এবং ভিটামিন বি এর একটি উপাদান ফোলাইট থাকে।| আর আছে প্রচুর আঁশ।|

রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এনরিচড করবার জন্য এইসময় আমের বিকল্প তো কিছু দেখি না।| তবে খাবার গ্রহণে পরিমিতিবোধ মনুষ্য জ্ঞানের প্রধানতম পার্ট।| ডায়াবেটিস প্যাশেন্ট আম খাবেন অতি অবশ্যই, তবে তা খুব মেপে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে; জিহ্বার দাসত্ব মেনে কিছুতেই নয়।|

আমাদের এবারের আমও বরাবরের মতো অতুল্য অমৃত সুধাবৎ।| একজন নিখাদ চাষীর অন্তরতর সাধনার ধন।| যা খেলে চির অহংকারীর মনের পাষাণও গলে গিয়ে উদারনৈতিকতা ও ভালোবাসার বাণভাসিতে ভাসতে পারে।|
সমাজের সকল উত্তমেরে এই আম এক পিস করে খাওয়াতে চাই।| কেন।| ‘চাষী’ কবিতায় তা বলে রেখেছেন কবি রাজিয়া খাতুন চৌধুরাণী।|

সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা,
দেশ মাতারই মুক্তিকামী, দেশের সে যে আশা।
দধীচি কি তাহার চেয়ে সাধক ছিল বড়?
পুণ্য অত হবে নাক সব করিলে জড়।
মুক্তিকামী মহাসাধক মুক্ত করে দেশ,
সবারই সে অন্ন জোগায় নাইক গর্ব লেশ।
ব্রত তাহার পরের হিত, সুখ নাহি চায় নিজে,
রৌদ্র দাহে শুকায় তনু, মেঘের জলে ভিজে।
আমার দেশের মাটির ছেলে, নমি বারংবার
তোমায় দেখে চূর্ণ হউক সবার অহংকার।

•| ফলের জন্য ভালোবাসা |•

কৃতজ্ঞতা: Fardeen Ferdous
সাংবাদিক ও গণ্যমাধ্যম কর্মী


Smiley face