ধূলিসাৎ ( ছোটগল্প )

39
Smiley face

 সবনাজ মোস্তারী স্মৃতি

বজ্রপাতের শব্দে কান ফেটে যাচ্ছে আমার অথচ বাইরে চৈত্রের খরা রোদে তাকানো যাচ্ছে না। ঘরে ফাইল হাতে দাঁড়িয়ে আছি আমি হতবম্ব ভাবে ।কেনো সবাই আমার কাছে সবটা লুকিয়েছে?আমি কিছু ভাবতে পারছি না।হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি ঘরের মেঝেতে পড়ে যাবো।দাঁড়িয়ে থাকার এতটুকু শক্তি আমার দেহে নেই।

দুহাত দিয়ে মুখটা ঢেকে বসে পড়লাম।চোখ দিয়ে অঝরে জল গড়িয়ে পড়ছে আমার।তবে খুব বেশিক্ষণ লাগলো না নিজেকে সামলে নিতে।ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে এসে আমার প্রিয় সাদা রং এর শাড়িটা পড়লাম।আজ আমি খুব সুন্দর করে সাজবো।অনেক দিন  ভালো মত সাজগোজ করিনি।আয়নায় নিজের মুখ দেখিনি। তবে আজ  চোখে কাজল দিবো,টিপ পড়বো,হাতে চুরি পড়বো।

আয়নার সামনে বসে আছি অনেকক্ষণ।তিয়াসকে কি ভাবে বলবো সব!তিয়াস কি সবটা মেনে নিতে পারবে।আমি আমার জীবনের হিসেবটা ঠিক মিলিয়ে উঠতে পারছি না।হয়তো জীবনের কিছু হিসেব কখনো মেলে না।

ছোট বেলায় অনেক  অংক মিলাতে না পেরে সে কি কান্নাকাটি শুরু করতাম খাতা কলম ছুরে ফেলে।আজ কি ছুরে ফেলে চিৎকার করে কাদঁবো।তবে সেই অংক আর আজ আমার জীবনের অংকের কি কোনো মিল আছে!

নেইতো ,

কোনো মিল নেই।

এই যেনো আকাশ পাতাল অমিল।

আচ্ছা তিয়াসের কি হবে !আমি ছাড়াতো ছেলেটার কেউ নেই।সামান্য কিছু হলেই তো ছেলেটা মলিন গলায় বলতো তোমার কিছু হয়ে গেলে কেমন করে থাকবো আমি।তার কথা শুনে আমি হাসতাম আর বলতাম কিছু হবে না।

সে সব সময় বলতো আমার সাথে কখনো ভালো কিছু হয় না ,আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলবো নাতো তুশি।আমি তার হাত ধরে বলতাম এমন কিছুই হবে না।তবে এখন ঠিক তাই হবে।অনিচ্ছা শর্তেও তাকে ছেড়ে চলে যেতে হবে আমাকে।না চাইলেও যেতে হবে।আমাদের এক সাথে সংসার করার স্বপ্ন, বুড়ো বুড়ি হবার স্বপ্ন কিছুই পূরণ হবে না।সমস্ত স্বপ্ন যেনো আজ মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে গেলো।

তিয়াসের হয়তো একদিন সংসার হবে।সেও বুড়ো হবে তবে অন্য কারো সাথে।আমাদের এক সাথে পাহাড় সমুদ্র কিছুই দেখা হলো না।অথচ দুজনের স্বপ্ন ছিলো আমরা পুরো পৃথিবী ঘুরবো একসাথে।

আমি বসে আছি বটতলার জসিম মামার চায়ের দোকানের সামনে।এখানেই তো তিয়াসকে আমি প্রথম দেখেছিলাম।আর এখান থেকেই আমাদের ভালোবাসাবাসির গল্প শুরু হয়েছিলো।না আজ আমাদের ভালোবাসাবাসির গল্পটা শেষ হবে না। হয়তো দ্বিগুন পরিমাণে বেড়ে যাবে তবে বিধাতা কিছু কিছু জিনিস দিয়ে আবার কেড়ে নেন আমাদের ক্ষেত্রেও হয়তো তাই।

তিয়াস আমাকে একদিন একটা কবিতা শুনিয়েছিলো সম্ভবত শাহরিয়া সাকিবের লেখা-

                                              শুনেছি ভালোবাসার নাকী মৃত্যু হয় ;

                                          যেদিন মৃত্যু হবে,সেদিন খবর দিও আমায়।

                                             আমি না হয় তার লাশের পাশে তিনখানা

                                                    জারবেরা ফুল দিয়ে অসবো।

                                                গাইবো পুরোনো সেই দিনের কথা

                                                                       অথবা

                                   জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়ে কাটবো সময় খানা।

                                                      সেদিন হয়তো থমকে যাবেনা

                                                                      সবকিছু

                                                               কিন্তু থেমে যাবে­;

                                         দুটো মানুষের ভালোবাসা নামক সম্পর্ক খানা।

                                                           আমি বটে কবি নই

                                                    কিন্তু এতটুকু বলতেই পারি

                                                                মানুষ বলে

                                                   “ভালোবাসার মৃত্যু নেই“।

সত্যিই কি তাই ভালোবাসার মৃত্যু নেই।হ্যাঁ তাইতো ভালোবাসার মৃত্যু কেমন করে হয়।মৃত্যু হয় ভালোবাসার মানুষটার।

তিয়াস আসছে ।আজ ও পান্জাবী পড়েছে।পান্জাবীতে ওকে দেখতে বেশ ভালো লাগে আমার। আজ অনেক দিন পর দেখা হচ্ছে ভেবেই হয়তো সে পান্জাবী পড়ে এসেছি , যেমনটা আমি তার পছন্দের শাড়ি পড়ে এসছি।তার মুখে হাসি। তবে এই হাসি কতক্ষণ থাকবে তা  জানি না।

তিয়াস আমার সামনে এসে বসলো ।ও সব সময় আমার মুখোমুখি বসে ।মুখোমুখি না বসলে নাকি তার ভালো লাগে না।আচ্ছা যখন আমি থাকবো না  তখন সে কার মুখোমুখি বসবে!

হয়তো আমাকে ভুলে নতুন মানুষ আসবে তার জীবনে।হয়তো আমার জায়গাটা সেই নতুন মানুষটা দখল করে নিবে। আমার কোনো অস্তিত্ব থাকবে না আর।

আমি আর ভাবতে পারছি না।বুকের ভিতরটা কেমন যেনো ভারি হয়ে আসছে। মরুভূমির মত খাঁখাঁ করছে।কোথাও কিছু নেই । চারিদিকে এত কোলাহল কিছুই যেনো আমি শুনতে পারছি না, দেখতে পারছি না।চারিদিকে শুধু শূন্যতা আর শূন্যতা।

তিয়াস আমার দিকে চায়ের কাপটা এগিয়ে দিয়ে বলল কিছু হয়েছে?তোমাকে এমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে কেনো?তোমার কি শরীর খারাপ?দুপুরে খেয়েছিলে?

এক সাথে এতগুলো প্রশ্নের উত্তর আমি কোনটাই দিলাম না।তার দিকে তাকিয়ে রইলাম ।

ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে আমরা আর মুখোমুখি বসবো না। এককাপে চা ভাগাভাগি করে খাবো না। বর্ষায় বর্ষাবিলাস করবো না।এক সাথে নদীর ধারে আর র্সূযাস্ত দেখবো না।অথচ এই সব কিছুই হবে নিয়মিত।প্রতিদিন র্সূযাস্ত হবে।বর্ষা আসবে সব কিছু তার নিয়ম করেই হবে অথচ আমরা দুজনে  হয়ে যাবো অনিয়ম।

তিয়াস আবার বলে উঠল কি হয়েছে তুশি ?

তুমি কি কোনো বিষয় নিয়ে আপসেট?

আমি কিছুই বলতে পারলাম না। কথা বলতে গেলেই হয়তো আমার বুকের মধ্যে জমা হওয়া বরফ গলে  চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়বে।

চা তো ঠান্ডা হয়ে গেলো! আমি কি আর  এক কাপ দিতে বলবো?

এই ভাবে তাকিয়ে আছো যে কি হয়েছে তোমার?

না আমি পারছি না তিয়াসের কোনো কথার জবাব  দিতে।এখন মনে হচ্ছে আমি যদি বোবা হতাম তবে হয়তো ভালো হত নিজের মৃত্যুর খবরটা হয়তো নিজের মুখে এই ভাবে দিতে হত না।

তিয়াসের হাত আমার দুহাতের মুঠোই এনে বললাম, তিয়াস  আমার লিউকেমিয়া ধরা পড়েছে,লাস্ট স্টেজ।বাড়িতে কেউ আমাকে কিছু বলেনি।আজ মায়ের আলমারি গোছানোর সময় হঠাৎ রিপোর্ট এর ফাইলটা পেয়ে যায়।প্রথমে ভেবেছিলাম মায়ের কোনো ফাইল হবে তবে পরে নিজের নাম দেখে একটু চমকে উঠি।

আমি আর বেশি দিন এই পৃথিবীতে থাকবো না। আমাদের আর দেখা হবে না। আমাদের সাজানো স্বপ্নগুলো পূরণ হবে না ।

তিয়াস কিছু বললো না ,আমাকে তার বুকের কাছে টেনে জরিয়ে ধরলো।আমার মনে হচ্ছিলো তিয়াস যদি এই ভাবেই আমাকে তার বুকের মাঝে লুকিয়ে রাখতে পারতো সব সময়ের জন্য। মৃত্যু নামের জিনিসটা যদি আমাকে আর ছুঁতে না পারতো।

সমাপ্ত


Smiley face