গল্প কবিতায় ঈদ আয়োজন

165
Smiley face

সাহিত্য যেখানে, আনন্দ সেখানে।                                                    সম্মানিত পাঠকবৃন্দ,  Flashnews24 এর পক্ষ থেকে সবাইকে পবিত্র ঈদ উল আযহার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।করোনা মহামারি কাটিয়ে এই পৃথিবী সুস্থ্য হয়ে উঠুক এই প্রত্যাশা করি।যারা সাহিত্য ভালোবাসেন তাদের জন্যই আজকের এই “গল্প কবিতায় ঈদ আয়োজন”।

বিশ্বাস ভঙ্গ ( কবিতা)                                                                                মফিজুর রহমান জামাল

আমি সবাইকে বিশ্বাস করি-                                                      বিশ্বাস করি মানুষকে,                                                           মানুষের প্রতিটি কথাকে,

সবার যত অজুহাত -যত বাহানা                                                বিশ্বাস করে তুষ্ট হই আমি,                                                           তুষ্ট হই অতি সহজেই।

তেমনি আমি বিশ্বাস করেছি তোমাকেও                                        বিশ্বাস রেখেছি তোমার ছলনাভরা যত ব্যাখ্যায়,                                    যা দিয়ে ঢেকেছ তুমি                                                                  একেকটা প্রতারনা একেকবার,                                                    আর ধোঁকা খেয়েছি বার বার তাতে শুধু আমি।

কত প্রানান্তকর চেষ্টাই না করেছি আমি-                                          ছুটে বেড়িয়েছি উল্কার মত,                                                        নির্ঘুম কাটিয়েছি রাতের পর রাত                                                বিলিয়ে দিয়েছি নিজের সবটুকু,                                                    শুধু তোমার জীবনকে কাব্যময় করে তুলতে

বদলে দিতে তোমার ভবিষ্যৎ–                                                  বুঝতে পারিনি-বুঝতে চাইও নি                                                      কি দুরভিসন্ধি ছিল তোমার প্রেমে,                                            ভালবাসায় ছিল শুধু ছলনা                                                        অমার্জনীয় কত প্রতারনা                                                              যা দিয়ে প্রমত্তা পদ্মার ভাঙ্গন হয়ে                                              ছিনিয়ে নিয়েছিলে এই হৃদয়ের ভিটেমাটি                                      অতলান্তে তলিয়ে দিয়ে আমার সর্বস্ব।

বিশ্বাসে অন্ধ আমি                                                               কখনও দেখিনি চোখ মেলে।                                                     আজ সব কিছুই গেছে ভেঙ্গে –                                                  আজ কোনও চাওয়া নেই, পাওয়া নেই                                            নেই কোনও কামনা, কোনও বাসনা,                                               নেই পিছুটান কোনও আমার;

পিছুটান শুধু কিছু স্মৃতি সেদিনের,                                              কোনও কিছু আর ফিরে না পাওয়ার।

গোলাপ গুচ্ছের গল্প ( ছোট গল্প )                                                      খোন্দকার মাহবুব

— ভাইয়া ফুল নেবেন,গোলাপ ফুল? একটা গোলাপ ফুল নেবেন আপুর জন্য? মাত্র পাঁচ টাকা!

ফেব্রুয়ারির মাঝ দুপুর। শহরের একমাত্র মিউনিসিপালিটি পার্কের একটা বেঞ্চে বসে আছে রাশেদ। বসে থাকতে থাকতে ঝিমুনি লেগে এসেছিল। হঠাৎ জামার হাতায় টান খেয়ে ফিরে তাকায়। ছোট্ট একটা বাচ্চা মেয়ে। হাতে কিছু গোলাপ ফুল নিয়ে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকেই। রাশেদ কে তাকাতে দেখে উৎসুক হয়ে আবারো বলে ওঠে মেয়েটি।

— ভাইয়া নিবেন একটা গোলাপ?”না রে নেব না।” ছোট করে উত্তর দেয় রাশেদ।

কেন যেন আনমনেই প্রশ্নটা করে বসে রাশেদ। সম্ভবত অনাহারে বাচ্চামেয়েটার মুখ শুকিয়ে এত্তটুকু হয়ে আছে।

— কিছু খাওয়া হয়নি তোমার? কিন্তু মেয়েটা প্রশ্ন শুনে চুপ থাকে। কত দাম সব গুলো গোলাপের?

— মেয়েটা উত্তর দেয়, “পঁচিশ টা গোলাপ আছে। যা ইচ্ছা হয় দিয়েন।”

মানিব্যাগ থেকে পাঁচশ টাকা বের করে মেয়েটির হাতে দেয় রাশেদ।

–ভাঙতি নাই যে ভাইয়া।

— লাগবে না রেখে দাও। রাশেদ বলে।

মেয়েটা অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে মানুষটাকে। পৃথিবীতে এখনো অবাক হতে পারার মত মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। মেয়েটা অবাক হবার দলে পড়ে। চুপচাপ পাশে থাকা গোলাপ গুলোর দিকে তাকায় রাশেদ …টকটকে লাল গোলাপ। কিন্তু কাকে গোলাপ দেবে? হালিমার কথা মনে পড়ে গেল হঠাৎ করে এই সময়। খুউব ভালোবাসতো ফুল। বিশেষ করে লাল গোলাপ। রাশেদ গোলাপ ফুল দিলে বাচ্চাদের মত খুশি হয়ে যেত। হুহ্ মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক……..কোথায় গেল সেই মধুর দিন গুলি! বুক চিরে হাহাকারের একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে।

আশে পাশে অনেক কপোত কপোতী পার্কে বসে আছে। গল্পগুজবে ব্যস্ত তারা। প্রায় সবার হাতেই কমবেশি গোলাপ রয়েছে। এসব এতক্ষণ খেয়াল করেনি সে। বসার বেঞ্চ গুলো একটাও ফাঁকা নাই জুটিদের কারনে। রাশেদ একাই বসে আছে, শুধু আর ছন্নছাড়া দু একজন কিছু পথশিশু বাদে।

আরে আজকে তো ১৪ই ফেব্রুয়ারি। হাতের ডিজিটাল ঘড়ির দিকে চোখ পড়তে চমকে ওঠে। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। কিন্তু এর মাঝেও একটা আলাদা বিশেষত্ব আছে এই দিনটার। আজ থেকে সাত বছর আগে রাশেদের সাথে হালিমার বিয়ে হয়েছিল। পারিবারিক ভাবে বিয়েটা হয়। সে সময় হালিমা অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী এবং রাশেদ মাস্টার্স শেষ করে একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছে। তিন ভাই বোনের মাঝে রাশেদ ছোট। অন্য দুই ভাই বোনের সংসার আছে। দেশের বাইরে থাকেন তারা। বাবা জীবিত আছেন সংসারে তবে মা অনেক দিন আগেই গত হয়েছেন। হালিমা তার বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। অনেক সুখের সংসার ছিল রাশেদ হালিমার। দুই বছরের মাথায় হালিমার গর্ভে রাশেদের একটি সন্তানও এসেছিল। কিন্তু অদৃষ্টের নির্মম লিখনি বোধ হয় অন্যরকম ছিল। বাবার বাসায় নিয়ে যাবার সময় হালিমার বাবা মা সহ তাদের প্রাইভেট কারটি একটি ট্রাকের সাথে এক্সিডেন্ট করে। তছনছ হয়ে যায় গড়ে ওঠা সুখের সংসার টা। খচখচ করে ওঠে দু চোখ। চোখের কোণা কেমন যেন ভেজা ভেজা লাগে রাশেদের। বারবার হেরে যাওয়া আর পরাজিত মানুষদের কথা ফুটে ওঠেনা কোন লেখকের কলমের আঁচড়ে, মৃদু হাসির সফলতার নায়কদের মুখেও শোভা পায়না। তবে তারাও বেঁচে থাকে বক্ষপাঁজরে এক আকাশ দুঃখ নামক পাথর বহন করে। নিরবে, নিভৃতে জ্বলেপুড়ে বিভৎস্য ঝলসানো মুখ টা কাউকে দেখাতেও পারেনা, তাদেরও আছে বেঁচে থাকার আকুতি।

পড়ন্ত বিকেলের জনারণ্য রাজপথ। মানুষ জন ব্যস্তসমস্ত ভাবে ছুটে চলছে নিজ নিজ গন্তব্যে। রাশেদ স্থির নিরাসক্ত চোখে চেয়ে দেখছে রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে। পার্ক থেকে বের হয়ে হালিমার কবরটা জিয়ারত করে বাজারে গেল কিছু ক্যাডবেরি চকলেট, একটা গিফট আর ছোট্ট একটা কেক কেনার জন্য। সব কেনার পর হাতে থাকা গোলাপ গুলো সহ হাঁটা শুরু করলো রাশেদ বাড়ির উদ্দেশ্যে। ফিরতে হবে চিরচেনা সেই ঘরে। যেখানে তার বাবা রয়েছেন। রয়েছে হালিমার স্মৃতি। উৎযাপিত হবে অন্যান্য বছর গুলোর মত, তার আর হালিমার স্মৃতির একান্ত উপস্থিতিতে।

কথা দাও রাখবে (কবিতা )                                                              নাজমা হাসান

আমি যদি তোমাকে ভালোবেসে মরে যাই চিরতরে,                          বলতে পারো স্মৃতি মুছবেনা?                                                        যদি চলে যাই বহুদূরে                                                                তুমি ভুলবে না?

হারিয়ে যায় যদি রাতের তিমিরে                                                    তুমি জেগে থাকবে;                                                                  দ্বীপ জ্বালাবে আমার হৃদয়ে?

হৃদয় হারাই তোমার মাঝে                                                          তুমি কি বুকে রাখবে?                                                           তোমার দুঠোটে যদি চুম্বন আঁকি ফিরিয়ে দিবে?

তোমার উষ্ণ বুকে যদি মাখা রাখি                                              আমায় জড়াবে আবেগে;                                                        তোমায় সাজাতে চাই আদর সোহাগে                                            বলো কথা রাখবে?

তোমায় আপন করে বুকে নিতে চায়                                              তুমি কি আমার বুকে আসবে?                                                  তোমার আঁখির নীচে ভেসে যেতে চাই                                            তুমি কি সাথে ভাসবে?

মেঘলা চুল দিয়ে ঢেকে রাখবো                                                    হৃদয় গহীনে থাকবে।                                                              তোমায় আমি ভালোবাসি                                                              কথা দাও রাখবে।

বিষে ভরা দুই হাজার বিশ (গদ্যকবিতা)                                                     অনুুপ চক্রবর্তী

‘ পল্লবী! আমার প্রেমিকা। দীর্ঘ চার বছরের প্রেম আমাদের। নদীর ধারে ফটিক কাকা র দোকানে পল্লবী কে প্রথম দেখা। প্রথম দেখাতেই ভালো লাগা, ভালো লাগা থেকেই উৎপত্তি আমাদের ভালোবাসার।

মাঝে অবশ্য বেশ কয়েকবার নদীর ঢেউ তীরে আছরে পরার মতো, আমাদের জীবনে ও ভাঙ্গণ সৃষ্টি করেছিল, তবে সেটা বেশী দিন স্থায়িত্ব লাভ করতে পারে নাই।

কিছু দিন যাবৎ পল্লবী র সাথে আমার দেখা নেই। আজকাল কথাও কম হয়। মোবাইল ফোনে কল দিলেই ব্যাস্ততা বেড়ে যায় পল্লবীর। হয়তো ভালোবাসা টা কমে গেছে। দীর্ঘ তিন মাস পল্লবীর সাথে নদীর ধারে ফটিক কাকা র কাছে ফুচকা খেতে যায় না। ফটিক কাকা র ফুচকার সাথে আমাদের ভালোবাসা উতপ্রত ভাবে জড়িয়ে।

কি জানি কেমন আছে ফটিক কাকা। শহর থেকে গ্রামে আসার পর বেলকুনি তে রেখে আসা বনসাই এর কোনো খবর জানি না। হয়তো গাছটা শুকিয়ে মারা গেছে।

পল্লবী শখ করে গাছটা কিনে দিয়েছিল। সেটার বয়স যতদূর মনে আছে তিন বছর হবে হয়তো। পল্লবীর সাথে দুই দিন থেকে কোনো যোগাযোগ নেই। কল দিলে ফোন অফ। পল্লবীর এক বান্ধবী প্রমা,তার সাথে আমার পরিচয় পল্লবীর মাধ্যমেই। চিন্তাগ্রস্থ হয়ে তাকে কল দিলে সেও রিসিভ করে না।

সন্ধ্যায় আরেকবার কল দিলে ফোন রিসিভ করে কন্ঠস্বর টা অদ্ভুত শোনায়। মনে হয় আমি যেন এক অচেনা প্রমার সাথে কথা বলছি। তাকে পল্লবীর কথা জিজ্ঞেস করতেই সাফ জানিয়ে দেয় কিছু জানে না।

পরের দিন দুপুরে প্রমা নিজে থকেই আমাকে কল দেয়, আমি একটু আশ্চর্য হলাম, প্রমা বলে উঠলো পল্লবী কোভিড ১৯ শে আক্রান্ত হয়ে কিছুক্ষণ আগে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে।

কাউকে না জানিয়ে শহরে চলে যায় শেষ বারের মতো পল্লবী কে দেখতে। কিন্তু সব শেষ। পল্লবী র শেষ কৃর্ত্য পুলিশ সম্পন্ন করে। শেষ বারের মতো পল্লবী র সাথে দেখা হয় না।

ছুটে যায় ফটিক কাকা র ফুচকার দোকানে, জানতে পায় ফটিক কাকা ও কোভিড ১৯ এ আক্রান্ত, রাতে ঘরে ফিরে বেলকুনি তে বনসাই এর দিকে লক্ষ্য করে দেখি জলের অভাবে গাছ ও শুকিয়ে মারা গেছে।

পল্লবী র সাথে শেষ বারের মতো কথা বলার সময় গাছটি র কথা জিজ্ঞেস করেছিল, বলেছিলাম হয়তো বেঁচে আছে। পল্লবীর সাথে ও শেষ কথাটিও মিথ্যে হলো তাহলে। হয়তো সুস্থ পৃথিবীটা আবার একদিন সুস্থ হয়ে উঠবে সেদিন তুমি পাশে থাকবে না।

ভালোবাসার মৃত্যু নেই (কবিতা)                                                শাহরিয়া সাকিব হিমাদ্র

শুনেছি ভালোবাসার নাকী মৃত্যু হয় না;                                          যেদিন মৃত্যু হবে,সেদিন খবর দিও আমায়।

  আমি না হয় তার লাশের পাশে                                              জারবেরা ফুল দিয়ে অসবো।                                                     গাইবো পুরোনো সেই দিনের কথা                                                 অথবা                                                                           জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়ে কাটবো সময় খানা।

  সেদিন হয়তো থমকে যাবেনা  সবকিছু                                              কিন্তু থেমে যাবে­;                                                                   দুটো মানুষের ভালোবাসা নামক সম্পর্ক খানা।

                                    আমি বটে কবি নই                                                                 কিন্তু এতটুকু বলতেই পারি                                                             মানুষ বলে                                                                           ভালোবাসার মৃত্যু নেই।

ঝলসে যাওয়া শরীর ( ছোটগল্প )                                                       সবনাজ মোস্তারী স্মৃতি

সকাল থেকেই মনটা ভীষণ খারাপ করছে।সারাদিন অফিসে মন খারাপ নিয়ে সব কাজ করেছে হিমা।বারবার মনে হচ্ছে আজ কিছু খারাপ হতে যাবে তার সাথে। মাঝে মধ্যে কাজের মাঝেও অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। কেনো আজ এমন মনে হচ্ছে হিমা তা বুঝতে পারছে না।

মনে মনে ভাবলো এমন করে আর ঠিক মত কাজ করতে পারবে না। তার একটু নিজেকে সময় দেওয়া দরকার। তবে এত এত কাজের মাঝে নিজেকে সময় দিবে কি ভাবে সেটা ঠিক বুঝতে পারছে না।

কোনো মতে অফিসের কাজ শেষ করে বের হয়েছে। পশ্চিম আকাশে সূর্য তখন ডুবি ডুবি করছে।আকাশে গোধূলি রং ছড়াচ্ছে। দেখতে বেশ চমৎকার লাগছে আকাশ। আকাশ সব সময় সুন্দর দেখায়, যখন নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভাসে তখন এক রকম সুন্দর্য, যখন কালো মেঘে ঢেকে যায় আকাশ তখন এক রকম আর সন্ধ্যার আকাশ আরেক রকম সুন্দর।

প্রকৃতির সব কিছুই সুন্দর। হিমার মন খারাপ থাকলে তার উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাটতে ভালো লাগে।

আজও তার ব্যাতিক্রম নয়।হঠাৎ করেই মাথাটা ভীষণ ব্যাথা করে উঠে। কেমন যেনো ঝিমঝিম করে।তবুও সে হাটবে। কারণ উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাটলে মন ভালো হয়ে যায়।

হিমা রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাবে ভাবে তবে আশেপাশে দোকান দেখতে পাচ্ছে না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক চেয়ে দেখে তবে চায়ের দোকান আপাতত কোথাও দেখা যাচ্ছে না।

হঠাৎ  বেলুন হাতে একটা ছোট ছেলে এসে বলে আপু বেলুন নাও।হিমা ছেলেটির দিকে তাঁকিয়ে হাসি মুখে বলে কতদিন পরে তোমাকে দেখলাম  তবে তোমার নাম মনে করতে পারছি না এই মুহুর্তে।ছেলেটি বলে ভুলো গেছো আপু “আমার নাম হাসান “।

হিমা হাসতে হাসতে বলে ও হ্যাঁ মনে পড়েছে, তোমার না আরেকটা ভাই ছিলো সে কোথায় এখন?

হাসান বলে, সে আমার সাথে এখন থাকে না আপু।

হিমা আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। ব্যাগ থেকে একশ টাকার একটা নোট বের করে হাসানের দিকে এগিয়ে বলে মুখটা তোমার আজ এত শুকনো দেখাচ্ছে কেনো বেলুন বিক্রি হয়নি?

হাসান বলে না আপু তার পর টাকাটা নিয়ে চলে যায়।একটা সময় এই বাচ্চাগুলোর সাথে অনেক সময় কাটিয়েছে হিমা। তবে এখন নিজের ক্যারিয়ার অফিস সব মিলিয়ে আর নিজের মত করে নিজেকে দেবার মত সময় বের করতে পারে না।কেমন যেনো রোবটের মত হয়ে গেছে।

ব্যাগের ভিতর ফোনটা বাজছে। ফোন হাতে নিতেই দেখে নৈস্বর্গ কল করেছে। আজ নৈস্বর্গের সাথে হিমার দেখা করার কথা ছিলো অথচ কাজের চাপে তা একদম মনে ছিলো না। ফোন রিসিভ করতেই অপর পাশ থেকে নৈস্বর্গ বলে উঠে, তুমি কোথায় হিমা? আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। হিমা চুপচাপ শুনে কিছু বলে না।

কি হলো চুপ কেনো ,কথা বলছো না যে?

হিমা বলে তুমি একটু অপেক্ষা করো আমি ১৫ মিনিটের মধ্যেই আসছি। আজ অনেক দিন পর নৈস্বর্গের সাথে দেখা হবে হিমার তবে এটা তার মনে না থাকার কারণে নিজের উপর নিজেই বিরক্ত হলো। কিছু দূরে এগিয়ে গিয়ে নৈস্বর্গের জন্য ফুল কেনে,বই এর সাথে ফুল অবশ্যই খুব সুন্দর একটা উপহার হবে।

ফুল নিয়ে হিমা রিকশা নেই। কিছুদূর যেতে কারা যেনো পেট্রোল বোমা মারে হিমাকে।মুহূর্তের মাঝেই ঝলসে যায় হিমার পুরো শরীর।নৈস্বর্গের সাথে তার আর দেখা হয় না। দেওয়া হয়না  বই আর ফুলগুলো। হিমার শরীরের সাথে ঝলসে যায় বই এর পাতা আর টকটকে লাল গোলাপগুলো।

রাজবংশ (কবিতা )
এস এম লিমান

এই গাঁয়ের শেষে এক ছিল রাজবংশ
আজি দিনে নেই আর বেশিকিছু অংশ।
নেই আর সংযোগ
দুর্যোগে যোগাযোগ।
ঠিক ক্ষণ নাস্মরণ , ঊন বা বিংশ?
গাঁয়ের ওই মাথাটার সেই রাজবংশ ||
পরদাদা বরক্রমে গড়ে তায় জমিদারি
ব্যবসায়-দৌলত, হিসেবে মেলা ভারি।
একে-একে তোলে গড়ে
বাড়িঘরে ওঠে ভরে,
সাথে বাড়ে ভৃত্য, পরিবার নর-নারী
দেখছো ওই জায়গা? সেখানেরই রাজবাড়ি ||
দিন যায়, যায় মাস পরদাদা পরলোক,
ছেলেপুলে মিলে তোলে ক্রন্দন ছলশোক!
শেষকৃত্য যে-ই শেষ-
সবে মিলে ধরে রেশ।
শেষমেষ অবশেষে ভাগ হয় ভূলোক।
গাঁয়ে সব বলেছিল, ‘নির্ঘাত আহাম্মক’ ||
দিনে-দিনে বাড়ে দেনা বসে-বসে হাওয়াতে,
ভিটেমাটি লাটে যায় বেঁচে-বেঁচে খাওয়াতে।
ঋণে-ঋণে কমে মাটি,
দিনে-দিনে লয় চাটি
-যা ছিল সব গেল অনাবশ্যক পাওয়াতে –
ভিটে ছেড়ে শুরু করে একে-একে যাওয়াতে ||
আজ আর নেই কিছু বাকি অবশিষ্ট
উত্তরসূরী মরে যাঁতাকলে পিষ্ট ।
পরদাদার ছড়ানো উলুবনে মুক্ত
পরিনাম যুদ্ধে লুপ্ত সে ক্ষুদ্ধ।
নেই আর কানা-কড়ি –
তড়িঘড়ি, বাহাদুরি ।
আহামরি নেই আর ছিঁটেফোঁটা অংশ,
রাজবংশের ভিটেয় আজ চড়ে রাজহংস ||

 বিষাদ (ছোট গল্প)                                                                  মেহেদী হাসান

দুইদিন ধরে ঘরে চাল নাই। প্রতিবেশীদের থেকে চাল চেয়ে আনতে হচ্ছে লকডাউনের দোহাই দিয়ে। একজনের থেকে আবার না। এক এক সময় এক একজনের থেকে। গত দুইদিনে পাঁচবার তিনবাড়ি থেকে চাল ধার করেছে রাবেয়া। রাবেয়ার স্বামী ফিরোজ পেশায় একজন রিক্সা চালক।

গত একসপ্তাহ ধরে ফিরোজ রিক্সা নিয়ে শহরের রাস্তায় বের হতে পারছে না। রিক্সা নিয়ে বের হলেও যাত্রীর চাপ নেই শহরের রাস্তায়। লকডাউনের কারনে খুব প্রয়োজন ছাড়া ঢাকা শহরের মানুষ বের হচ্ছে না। টিভিতে প্রতিনিয়ত দেখাচ্ছে প্রবলভাবে করোনা রুগী বেড়ে চলেছে। রামপুরা, বাড্ডা,ধানমন্ডি, গুলশান, ফার্মগেট এই এলাকাগুলোতে বেশি। রাস্তায় রাস্তায় পুলিশ টহল দিচ্ছে। মাঝে মাঝে রাস্তায় লোকজনের দেখা মিলছে। মেইন রাস্তায় না, বাইপাস রাস্তা গুলোতে। শহরের এই অবস্থা দেখে ফিরোজ কিছুতেই রিক্সা নিয়ে বের হতে সাহস পাচ্ছে না।

রাবেয়া মলিন চেহারা নিয়ে ঘরে ফিরেছে। চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে এক আকাশ বিষন্নতায় ঘিরে রেখেছে রাবেয়াকে। বিষন্নতায় চেহারা কিছুটা ফেঁকাসে হয়ে গেছে। সেই ফেঁকাসে চেহারায় দাঁড়িয়ে আছে ফিরোজের সামনে।

ফিরোজ সিগারেট টানছে। রাবেয়ার হাতে লাল রঙের একটা ব্যাগ দেখে ফিরোজ জিজ্ঞসু গলায় বললো, ” কিরে কই গেছিলি? হাতের ব্যাগের আবার কি?” রাবেয়া হাতের থেকে ব্যাগটা রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিলো, ” জামু আর কই! পেটের খাবার আনতে গেছিলাম।” “তুই এই অসুস্থ শরীর লইয়া এমনে দৌড়াদৌড়ি করিস, যদি তোর পেটের বাচ্চাটার কোনো সমস্যা হয়, তহনতো আমার সব শেষ হইয়া যাইবোরে রাবেয়া।” রাবেয়া মুচকি হাসি দিয়ে আবার বললো, ” আরে কি হইবো? সমস্যা হইবো না।” “তারপরও তুই একটু সাবধানে থাকবি। তোগো কিছু হইলে আমি কি নিয়া থাকুম! আমি কাল থেইকা রিক্সা লইয়া বাহির হমু।” রাবেয়া মুখ মলিন করে বললো, ” আপনার যদি কোনো সমস্যা হয় তাহলে আমার কি হইবো?” ” ঘরে বইয়া থাকলে তো আর পেটে খাওয়ান জুটবো না। এমনে ধার-দিনা কইরা চলতেছি সেগুলোও তো শোধ করতে হইবো!” ফিরোজ ক্ষীণ গলায় আবার বললো, “আমারে লইয়া চিন্তা করা লাগবো না। তুই নিজের খেয়াল রাখবি সবসময়। নিজের লাইগা না হলেও পেটের বাচ্চার লাইগা।” বিকেলেই ফিরোজ রিক্সা নিয়ে বের হয়েছে। বাড়িতে ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বেজেছে।

ইনকাম হয়েছে চারশো ত্রিশ টাকা। আসার সময় বাজার করে নিয়ে এসেছে পাঙ্গাশ মাছ আর ডাঁটাশাক। রাবেয়া বসে মাছ কাটছে তাঁর পাশে বসেই ডাঁটাশাক কাটছে ফিরোজ। রান্না শেষ করে খেতে খেতে প্রায় সাড়ে এগারোটা বেজে গেলো। দ্রুত ঘুমাতে হবে। সকালে আবার রিক্সা নিয়ে বের হতে হবে। সেই চিন্তা করে বারটার মধ্যে ঘুমিয়ে গেলো তারা।

মাত্রই সূর্যের ঘুম ভাঙলো। সূর্যের ঘুম ভাঙার আলোতে ঘুম ভেঙে গেলো ফিরোজের। পাশে ঘুমিয়ে আছে রাবেয়া। ফিরোজ রাবেয়াকে ডাক না দিয়ে উঠে বের হলো। রিক্সা গ্যারেজের পাশে খাইরুলের পরটার হোটেল থেকে তিনটা পরটা আর এক প্লেট ডাল খেয়ে গ্যারেজ থেকে রিক্স নিয়ে রাস্তায় নেমে গেলো ফিরোজ। সকাল সকাল একটু লোকজন যাচ্ছে। কেউ বের হয়েছে বাজার করতে,কেউ অফিসের জন্য।

লকডাউনে মোটামুটি সবকিছু বন্ধ থাকলেও খোলা আছে অফিস,আদালত। তাই একটু আধটু লোকজনের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। ভারী ভারী যান বহন চলাচল নেই। রিক্সা, সিএনজি, মোটরসাইকেল চলছে শুধু। তবুও সেগুলোর উপর কড়া নজরদারি রেখেছে টহলকারী পুলিশেরা। হুটহাট করে ধরে ধরে জরিমানা করছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। বেলা এগারোটা বেজে সাত মিনিট। যাত্রীর বেশি চাপ না থাকায় ফিরোজ তখন রিক্সা থামিয়ে সংসদ ভবনের সামনে বসে বসে সিগারেট টানছিলো।

হুইসেল বাজাতে বাজাতে আসছিলো ভ্রাম্যমাণ আদালতের গাড়ী। হাতের সিগারেট ফেলে রিক্সা নিয়ে চালানো শুরু করার সাথে সাথে দু’জন কনস্টেবল এসে ফিরোজের হাত টেনে ধরলো। রিক্সা পাশে রেখে কনস্টেবল দু’জন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নিয়ে গেলো ফিরোজকে।

ইতিমধ্যে ফিরোজের পুরো শরীর ঘামে থৈথৈ করছে। যেন মনে হচ্ছে সদ্য গোসল করে এসেছে কিন্তু শরীরের পানি মুছতে ভুলে গেছে। ম্যাজিস্ট্রেট ক্ষীন গলায় বললো, “লকডাউনের মধ্যে আপনি রিক্সা নিয়ে বাহিরে কেন?” ফিরোজ মলীন গলায় বললো, ” স্যার, আমরা রিক্সা চালায় পেটের ক্ষুধা মিটাই। রিক্সা নিয়ে না বাইরালে আমরা খামু কি?” ফিরজের কথা শুনে ম্যাজিস্ট্রেট কিছুটা রেগে গেলেন। একটা রাগান্বিত ভঙ্গিতে বললেন, ” এখন যদি তোমার রিক্সাটা আটক করে নিয়ে যায় তখন তো পেটে আরো খাবার জুটবে না। তখন কি করবো” বলেই ম্যাজিস্ট্রেট কনস্টেবলকে বললেন, ” রিক্সা ট্রাকে উঠাও। আর পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করো। টাকা পরিশোধ করে রিক্সা পাবে” কথাটি বলেই ম্যাজিস্ট্রেট একটা কাগজ ধরিয়ে দিলো ফিরোজের হাতে।

কাগজটা হাতে নিয়ে ফিরোজ গলগল করে কান্না করে দিলো। ফিরোজের চোখের পানির দিকে না তাকিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট গাড়ীতে করে চলে গেলেন। এই মুহুর্তে পৃথিবীর সব থেকে অসহায় মানুষের মধ্যে ফিরোজ অন্যতম একজন। এই মুহুর্ত কি করবে ফিরোজ ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। বাড়িতে খাবার নেই,হাতে টাকা পয়সা নেই, এদিকে ঘরে স্ত্রী অসুস্থ।

 


Smiley face