‘মোটা’ শিশুদের ভর্তি নেয় না প্রিপারেটরি স্কুল

51
Smiley face

ভর্তির যোগ্যতা ও নিয়মাবলিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি মোটা হরফে উল্লেখ করেছে, লটারিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও যদি কোনো শিক্ষার্থী প্রাতিষ্ঠানিক শর্ত (শিক্ষার্থীর যোগ্যতা) পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে সে ভর্তির জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ শর্তের অতিরিক্ত ওজন বা কম ওজন, বেশি লম্বা বা খর্ব কোনো শিশু স্কুলটিতে ভর্তি হতে পারবে না।

মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের উল্লেখিত শর্তগুলোকে গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যেখানে সব শিশুকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনার জন্য গুরুত্ব দিচ্ছে, সেখানে এ ধরনের শর্ত আরোপ দুঃখজনক। এই শর্ত সরকারের ‘সবার জন্য শিক্ষা’ কর্মসূচির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের পরিপন্থী। ওজন কম বা বেশি তো কোনো বিষয়ই নয়, প্রতিবন্ধিতা থাকলেও শিশুকে স্কুলে ভর্তি করতে হবে। স্কুলটি ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় যে নিয়ম করেছিল, সেই নিয়ম এখন চলবে না। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে বলেন, নীতিমালার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ নয়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বিধিবদ্ধ কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।

প্লে গ্রুপে শিশুশিক্ষার্থী ভর্তির জন্য স্কুলটিতে ২২ অক্টোবর লটারি হয়। এখন চলছে ভর্তির অন্যান্য প্রক্রিয়া। স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এবার প্লে গ্রুপে বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণে ২০০ মেয়ে ও ৯০ জন ছেলে হিসেবে মোট ৫৮০ শিশুকে নেওয়া হবে।

শিক্ষার্থীর যোগ্যতায় যা আছে

স্কুলটির ওয়েবসাইটে ২০২২ সালে প্লে গ্রুপে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীর যোগ্যতা ও নিয়মাবলির একটি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া আছে। কয়েকজন অভিভাবকের কাছ থেকে বিজ্ঞপ্তির শর্তের বিষয়টি জানতে পারে প্রথম আলো। পরে মোহাম্মদপুরের আসাদ অ্যাভিনিউয়ে অবস্থিত স্কুলের একটি শাখার অফিসকক্ষ থেকে গতকাল বুধবার বিজ্ঞপ্তিটি সংগ্রহ করা হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, ‘শিক্ষার্থীর যোগ্যতা’ অংশে তিনটি শর্ত দেওয়া আছে। এগুলো হলো—বয়স, উচ্চতা ও ওজন।

বয়সের শর্তে লেখা আছে, ১ জানুয়ারি ২০২২ সালে বয়স চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে হতে হবে।

উচ্চতার শর্তে বলা হয়েছে, তিন ফুট থেকে তিন ফুট আট ইঞ্চির মধ্যে হতে হবে।

ওজনের শর্তে লেখা আছে, ১৩ থেকে ২১ কেজির মধ্যে হতে হবে।

ওজনের অংশে তিনটি উপশর্ত দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো—শিক্ষার্থীর সব দুধদাঁত (২০টি) অটুট থাকতে হবে। শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ হতে হবে। ছোঁয়াচে রোগ থাকলে ভর্তির জন্য বিবেচিত হবে না।

‘মোটা শিশুরা দুষ্টু হয়’

‘শিক্ষার্থীর যোগ্যতা’সংক্রান্ত শর্তের ব্যাপারে জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ বেলায়েত হুসেন প্রথম আলোকে বলেন, ১৯৭৬ সালে স্কুল প্রতিষ্ঠার সময়ই এই যোগ্যতাগুলো ঠিক করা হয়। তখন থেকেই এই নিয়ম মেনে চলা হচ্ছে। নিয়মে আর পরিবর্তন আনা হয়নি। এ বিষয়ে স্কুলের অভিভাবক কমিটির মধ্যে দু-একজন ছাড়া অন্য কেউ জোরালোভাবে আপত্তি জানাননি। এ কারণে তাঁরা নিয়ম পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেননি।

বেলায়েত হুসেন আরও বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য, শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলে সুন্দর একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা। মোটা বাচ্চারা দুষ্টু বেশি হয়। তাদের চেয়ে অন্য বাচ্চাদের সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।’

দুধদাঁত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক অভিভাবক সন্তানদের বয়স কমিয়ে প্লে গ্রুপে ভর্তি করানোর চেষ্টা করেন। এতে বয়সে ছোটরা ওই সব বড় শিশুর সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারে না। এ কারণে বয়স হিসাব করতে দুধদাঁত না পড়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থীকে ‘শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ হতে হবে’ বলতে প্রতিবন্ধী শিশুদের ভর্তি নেওয়া হবে না বোঝানো হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বলেন, ‘হ্যাঁ, তা-ই। স্বাভাবিক শিশুদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিবন্ধী শিশুরা পড়তে পারে না। এখানে অভিভাবকেরা অনেক অর্থ খরচ করে সন্তানদের পড়ান। প্রতিবন্ধী শিশুরা পিছিয়ে থাকে। তাদের দিকে আলাদা নজর দেওয়ার মতো শিক্ষক আমাদের নেই। তারপরও আমাদের স্কুলে কিছু প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী পড়ে। আমি মনে করি, প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য প্রতিবন্ধীদের জন্য গঠিত স্কুলই ভালো।’

সরকারি স্কুলে শিশু ভর্তির ক্ষেত্রে বয়স ছাড়া আর কোনো শর্ত নেই বলে জানান রাজধানীর শাহজাদপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফাহিমা আক্তার। তিনি প্রথম আলোকে তিনি বলেন, প্রাক্‌–প্রাথমিকে ভর্তির জন্য শিশুর বয়স পাঁচ বছর হতে হবে। ওজন, দুধদাঁত নিয়ে শর্ত নেই। প্রতিবন্ধী শিশুদের ভর্তি করার ব্যাপারেও কোনো বাধা নেই। তাঁর স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এক শিশু পড়ে।

মানসিক বিকাশের অন্তরায়

ভর্তির ক্ষেত্রে ওজনের মতো বিষয়ে শর্ত দেওয়াকে শিশুর মানসিক বিকাশের অন্তরায় বলে মনে করেন ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতালের উপপ্রধান পুষ্টি কর্মকর্তা ফারজানা আনজিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অভিভাবকেরা শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য স্কুলে দেন। স্কুলজীবনের শুরুতেই যদি শিশু এ ধরনের শর্তে আটকে যায়, তাহলে তা শিশু ও অভিভাবক উভয়ের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করে।

ফারজানা আনজিন আরও বলেন, এখন শিশুদের খেলাধুলার জন্য খোলা মাঠ কম। বেশির ভাগ স্কুলে মাঠও নেই। খাদ্যে এখন ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা বেশি। অন্যদিকে ক্যালরি পোড়ানোর মাত্রা কম। ফলে অনেক শিশুই মোটা হতে পারে। চার থেকে পাঁচ বছর বয়সীর মধ্যে কম ওজনের (১০-১২ কেজি) শিশু থাকতে পারে। আবার এই বয়সীদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজনের (২৬-২৭ কেজি) শিশুও থাকতে পারে। ১৩ থেকে ২১ কেজি ওজন বেঁধে দেওয়ার মানে হচ্ছে, কম ওজন বা বেশি ওজনের শিশু ওই স্কুলে ভর্তি হতে পারবে না। সাধারণত ছয় বছর বয়সের পর শিশুর দুধদাঁত পড়ে। তবে অতিরিক্ত ওজনের শিশুর পাঁচ বছরের কম বয়সেও দুধদাঁত পড়ে যেতে পারে।

নিয়মটি তুলে দেওয়া উচিত

স্কুলটির দুটি শাখায় গিয়ে কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা ‘শিক্ষার্থীর যোগ্যতা’ অংশের কিছু শর্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য’, ‘আপত্তিকর’ ও ‘বৈষম্যমূলক’ বলে অভিহিত করেন।

স্কুল ছুটির পর মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে রিকশা খুঁজছিলেন এক অভিভাবক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্কুল কর্তৃপক্ষ ভর্তির ক্ষেত্রে অনেক কিছু দেখে। প্লে গ্রুপে ভর্তির সময় আমার মেয়ে ঠিকঠাক গড়নের ছিল। তাই ওজন নিয়ে চিন্তা ছিল না। মেয়ে লটারিতে টিকে যাওয়ার পর স্কুল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসক দিয়ে ওর ওজন ও দুধদাঁত পরীক্ষা করে। ওজন, দুধদাঁতসহ সব ঠিকঠাক থাকায় “ও” সহজেই ভর্তি হতে পারে। তবে ওজনের নিয়মটি তুলে দেওয়া উচিত। কারণ এখন ঢাকায় মাঠ নেই। খেলাধুলার সুযোগ নেই। খাদ্যাভ্যাসের কারণেও শিশুরা মোটা হয়।


Smiley face