টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ: সেমিফাইনাল পাকিস্তান ক্রিকেট দলের জন্য প্রতিবাদের মঞ্চ আর অস্ট্রেলিয়ার নিজেদের প্রমাণের

28
Smiley face

আজ বৃহস্পতিবার আরও পরের দিকে সংযুক্তআরব আমিরাতের দুবাইয়ে পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়া মুখোমুখি হচ্ছে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে।

এই ম্যাচে জয়ী দল প্রথম সেমিফাইনালের বিজয়ী নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামবে ১৪ই নভেম্বর, অর্থাৎ আগামী রবিবার।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর এক মাস আগেই পাকিস্তানের ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তাতে এই বিশ্বকাপটা কেবল মাঠে ক্রিকেট খেলার সীমাবদ্ধ থাকেনি দলটির জন্য।

পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ বাতিল করেছিল নিউজিল্যান্ড – এবং সেটি ছিল পাকিস্তানের মাটিতে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ শুরু হওয়ার নির্ধারিত সময়ের মাত্র ঘণ্টাখানেক আগে। এরপর সফর বাতিল করে ইংল্যান্ড।

তখন মাত্রই পাকিস্তান বোর্ড প্রধানের চেয়ারে বসা রমিজ রাজা বলেছিলেন, “মাঠেই জবাব দেয়া হবে।”

পরপর দুটো সফর বাতিল প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করে তোলে রমিজ রাজাকে। “আমাদেরকে ব্যবহার করে ছুড়ে ফেলা হয়েছে,” মন্তব্য করেছিলেন সাবেক এই পাকিস্তানী তারকা।

পুরো বিষযটিকে ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বের একটা ষড়যন্ত্র’ হিসেবেই দেখেছিলেন রমিজ রাজা।

তবে সেই ক্ষতে খানিকটা প্রলেপ দেয়া হয়েছে চলমান এই বিশ্বকাপের মধ্যেই – ইতোমধ্যেই অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের ক্রিকেট দল নিশ্চয়তা দিয়েছে যে তারা পাকিস্তানে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলবে।

ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান নির্বাহী টম হ্যারিসন লাহোর সফরে গিয়েছেন গতকাল। শেষ মুহূর্তে সিরিজ বাতিলের কারণে সম্পর্কে যে অবনতি হয়েছে সেটা ঠিকঠাক করতেই এই সফর।

ইসিবি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে আগের শিডিউল মত পাঁচটি নয়, বরং আরও দুটি বাড়িয়ে মোট সাতটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলবে ইংল্যান্ড ও পাকিস্তান।

ইসিবির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “পাকিস্তান ও ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক সম্পর্ক ঠিকঠাক করতেই এই সফর।”

পাকিস্তানের জবাব

সুপার টুয়েলভ পর্বে পাঁচ ম্যাচে পাঁচটিতে জয় তুলে নিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে পাকিস্তান।

অর্থাৎ ‘জবাব’ দেয়ার যদি কোন বিষয় থাকে, তাহলে পাকিস্তান এখন পর্যন্ত সেটা ভালোভাবেই দিচ্ছে – যদিও ক্রিকেট কূটনীতি মেনে অধিনায়ক বাবর আজম কিংবা পাকিস্তান ক্রিকেট দলের কেউই এ নিয়ে কোনও কথা বলেননি। বাইরে তাদের আলোচনা ক্রিকেটেই সীমাবদ্ধ, আর খেলাটা তারা বেশ ভালোই খেলছে।

তবে এখন লড়াই সেমিফাইনালে – যেখানে শুধু ভালো খেলাটাই যথেষ্ট নাও হতে পারে, এখানে গুরুত্বপূর্ণ হবে চাপ সামলানোর ব্যাপারটাও।

অস্ট্রেলিয়া হয়তো এক্ষেত্রে খানিকটা সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা অনেকটা নিয়মিতভাবে বিভিন্ন টুর্নামেন্টের ফাইনাল সেমিফাইনালের মতো ম্যাচগুলো খেলেছে, ফলে চাপ সামলানোর বিষয়টি তাদের জন্য তুলনামূলক সহজ।

গত এক দশকে অস্ট্রেলিয়া দলের আগের সেই আগ্রাসী দাপট দেখা যায়নি, তবে তারা নিয়মিত সেমিফাইনাল খেলেছে এবং একটি ওয়ানডে বিশ্বকাপও জিতে নিয়েছে।

তবে টি-টোয়েন্টির বেলায় সাফল্য অস্ট্রেলিয়ার হাতে এখনও ধরা দেয়নি। ওয়ানডেতে পাঁচবার বিশ্বকাপজয়ী এই দলটি আজও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিততে পারেনি।

২০১০ সালে ফাইনালে উঠেও ইংল্যান্ডের কাছে হেরে রানার-আপ থাকতে হয়েছে তাদের।

পাকিস্তান শক্তিশালী ক্রিকেট ইউনিট

পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের বেশিরভাগই এখন আছেন ফর্মের তুঙ্গে। পাঁচ ম্যাচের পাঁচটিতে জয় পাওয়া দলের পাঁচজন ভিন্ন খেলোয়াড় ম্যাচসেরার পুরস্কার পেয়েছেন।

এতে প্রমাণিত হয় যে পাকিস্তানের এই দলটি কোনও একজন তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়।

বাবর আজম ও মোহাম্মদ রিজওয়ান ব্যাটিংয়ের ভিত গড়ে দিয়েছেন প্রায় প্রতিটি ম্যাচে। গতি বাড়িয়ে রান তোলার কাজ করছেন আসিফ আলী – যিনি এখন পর্যন্ত ২৩ বল খেলে সাতটি ছক্কা মেরেছেন।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে এক ওভারে ৪টি ছক্কা মেরে ম্যাচ জিতিয়েছেন তিনি। অক্টোবর মাসের সেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার পেয়েছেন তিনি আইসিসি’র কাছ থেকে।

শোয়েব মালিক ১৮ বলে ৫৪ রান তুলেছেন স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। নামিবিয়ার বিপক্ষেও হাফিজ, রিজওয়ান দারুণ ব্যাট করেছেন।

ভারতের বিপক্ষে ১০ উইকেটের জয়ের পেছনে আছে শাহীন শাহ আফ্রিদির ফাস্ট বোলিং এবং হারিস রউফ ও ইমাদ ওয়াসিমের পরিমিতিবোধ।

এই বোলাররা যে শুধু উইকেট পাচ্ছেন তা নয়, বরং তাদের ইকোনমি রেটও বেশ ভালো।

তাই সব মিলিয়ে পাকিস্তান ক্রিকেট দল ইউনিট হিসেবে এখন শক্ত অবস্থানে রয়েছে। মাঠে তাদের শারীরিক ভাষা এই বার্তাই দিচ্ছে যে একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে গোটা দল খেলছে।

বাংলাদেশের ক্রিকেট বিশ্লেষক নাজমুল আবেদীন ফাহিমের মতে, পাকিস্তানের এখন একটাই প্রতিপক্ষ – ‘নকআউট পর্বের মানসিক চাপ’।

অস্ট্রেলিয়ার চাপ কম তবে সমস্যা ফর্মে

দল হিসেবে অস্ট্রেলিয়াও ভালো অবস্থানে রয়েছে। তাদের রয়েছে একটি ব্যালান্সড টিম, একটি আদর্শ সীমিত ওভার ক্রিকেট দল।

পেস বোলিং অ্যাটাকে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম সেরা তিনজন – মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজলউড এবং প্যাট কামিন্স।

স্পিনার অ্যাডাম জাম্পা চমৎকার খেলছেন, আর তাকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন পার্ট টাইমার গ্লেন ম্যাক্সওয়েল।

দুই ব্যাটসম্যান অ্যারন ফিঞ্চ ও ডেভিড ওয়ার্নার ফর্মে ফিরেছেন। ওয়ার্নার দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে ছিলেন চোটের কারণে, তবে এই বিশ্বকাপে একটি অপরাজিত ৮৯ রানের ইনিংস খেলেছেন – মোট ২টি অর্ধশতক হাঁকিয়েছেন তিনি।

বড় ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা আছে স্টিভেন স্মিথ, ওয়ার্নার, ম্যাক্সওয়েল, স্টার্কদের।

অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চ পরিষ্কার করেই বলেছেন আমিরাতে তারা কেন এসেছেন। “বিশ্বকাপ জিততে একটা স্পষ্ট পরিকল্পনা হাতে নিয়েই আমরা খেলতে এসেছি।”

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মঞ্চ এখন প্রস্তুত। পাকিস্তানের ফর্ম আর অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতার খেলা হবে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে।


Smiley face