শ্রদ্ধার্ঘ্য জ্ঞান বিরিক্ষি হাসান আজিজুল হক

61
Smiley face

শ্রদ্ধার্ঘ্য জ্ঞান বিরিক্ষি হাসান আজিজুল হক

বসবাস করেছেন বিশ্বদর্শনের অথৈই সায়রে |
আর নিরেট ও নিখাদ উচ্চারণে বিবৃত করে গেছেন বিচিত্র মানুষের জীবনদর্শন | আমাদের কালের সেই দার্শনিক হাসান আজিজুল হক আজ চিরায়ত নিভৃতিতে ঘর বাঁধলেন |

দেশভাগ তাঁকে আজন্মের ব্যথায় জর্জরিত করে রেখেছিল | মুক্তিযুদ্ধের মহীসোপানে ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের স্বরূপ সন্ধানে ব্রতচারী ছিলেন | দেশাত্মবোধকে আঁকড়ে ছিলেন আমৃত্যু |

দেশভাগের ট্রাজেডি বয়ে বেড়ানো হাসান আজিজুল হকের প্রিয় গান ছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের…
‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে’

১৯১১ সালে লেখা রবিঠাকুরের স্বদেশ পর্যায়ের এই গানটির (পরবর্তীতে ভারতের ন্যাশনাল অ্যান্থেম হিসেবে গৃহীত) উদার বাণী এই লেখক প্রায়ই উচ্চারণ করতেন |

পঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মরাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ
বিন্ধ্য হিমাচল যমুনা গঙ্গা উচ্ছলজলধিতরঙ্গ
তব শুভ নামে জাগে, তব শুভ আশিস মাগে,
গাহে তব জয়গাথা |

অহরহ তব আহ্বান প্রচারিত, শুনি তব উদার বাণী
হিন্দু বৌদ্ধ শিখ জৈন পারসিক মুসলমান খৃস্টানী
পূরব পশ্চিম আসে তব সিংহাসন-পাশে
প্রেমহার হয় গাঁথা |

দেশভাগের ট্রাজেডিকে উপজীব্য করে লেখা প্রথম আলো’র বর্ষসেরা উপন্যাস ‘আগুনপাখি’তে তিনি লিখলেন, ‘আমাকে কেউ বোঝাইতে পারলে না যি সেই দ্যাশটো আমি মোসলমান বলেই আমার দ্যাশ আর এই দ্যাশটি আমার লয় | আমাকে আরো বোঝাইতে পারলে না যি ছেলেমেয়ে আর জায়গায় গেয়েছে বলে আমাকেও সিখানে যেতে হবে | আমার সোয়ামি গেলে আর আমি কি করব ? আমি আর আমার সোয়ামী তো একটি মানুষ লয় , আলেদা মানুষ | খুবই আপন মানুষ, জানের মানুষ , কিন্তুক আলেদা মানুষ |

‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ -এ হাসান আজিজুল হক লিখেছেন…
‘মানুষ কেমন করে মরে যায় তা সে জানে না | কিন্তু সে জানে মরার ঠিক আগে মানুষ তার সমস্ত জীবনের ছবি একবারে দেখতে পায় |’

যাপিত জীবনের চালচিত্রে যে আয়নাটি লেখক আজন্ম সাজিয়ে রেখেছিলেন শেষবেলায় সেখানে নিশ্চয় সত্য, সুন্দর ও শুভবোধের ছবিই দেখতে পেলেন তিনি |

হাসান আজিজুল হক ১৯৩৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন | জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি রাজশাহীতে কাটিয়েছেন | ১৯৭৩ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৪ সাল পর্যন্ত একনাগাড়ে ৩১ বছর অধ্যাপনা করেন | এরপর থেকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাশে নগরের চৌদ্দপায় আবাসিক এলাকায় বসবাস করে আসছিলেন |

সাহিত্যে অবদানের জন্য হাসান আজিজুল হক ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান | ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে | ২০১৯ সালে তিনি স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন |

আত্মজা ও একটি করবী গাছ, আগুনপাখি, পাতালে হাসপাতাল, জীবন ঘষে আগুন, একাত্তর করতলে ছিন্নমাথা, শ্রেষ্ঠ গল্প, শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ, মা মেয়ের সংসার, স্মৃতিকথন, কথাসাহিত্যের কথকতা, উঁকি দিয়ে দিগন্ত তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাকর্ম |

মননশীল এই লেখকের
প্রয়াণে গভীর শোক জানাই |
আমাদের হার্দিক শ্রদ্ধার্ঘ্য রাখা থাকল
আমাদের কালের জ্ঞানবিরিক্ষি কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হকের পূণ্য স্মৃতির প্রতি |✍️

……………………….
ফারদিন ফেরদৌস                               সাংবাদিক / লেখক                                           ১৫ নভেম্বর ২০২১


Smiley face