আগে ১৫ হাজারের বাসা, এখন ১১ হাজার টাকা

20
Smiley face

তৌহিদুর রহমান। গ্রামের বাড়ি খুলনায়। প্রায় ২০ বছর ধরে ঢাকায় থাকেন। কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে বর্তমানে ধানমন্ডিতে একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত। হাজারীবাগের টালি অফিস রোডে দুই বেড ও এক ডাইনিং-ড্রয়িং রুমের ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকতেন।

কিন্তু মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে ঢাকার ২০ বছরের জীবনে এবারই বেশ তিক্ত অভিজ্ঞতা হলো তার। গত আট বছর ধরে হাসপাতালটিতে চাকরি করছেন। এতদিন বেতন-ভাতা ছিল নিয়মিত। কিন্তু এখন অনিয়মিত। গত ঈদে বোনাসও পাননি।

স্ত্রী, দুই ছেলে-মেয়ে ও ছোট ভাইকে নিয়ে পাঁচজনের সংসার। যে ফ্ল্যাটে গত পাঁচ বছর ধরে ছিলেন সেটির ভাড়া ছিল ১৫ হাজার টাকা। এতদিন যা বেতন পেতেন তা দিয়ে বাড়ি ভাড়া দেয়ার পর ভালোমতোই সংসারের খরচ চলত, তবে কিছু জমাতে পারতেন না।

কিন্তু এবার বিধিবাম। করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে হাসপাতালের কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। হাসপাতালের আয়ও বন্ধ। তাই চিকিৎসকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনও হয়ে গেল অনিয়মিত।

নিয়মিত বেতন-বোনাস না থাকলেও বাড়ি ভাড়া ও সংসার খরচ ঠিকই আছে। এমনকি করোনার কারণে বাড়তি স্বাস্থ্য সচেতনতায় সংসার খরচও বেড়েছে। এ অবস্থায় আর কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না তৌহিদুর। তাই বাসা বদল করলেন। পাশের একটি বাড়িতে ১১ হাজার টাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া নেন, চলতি মাসের প্রথম দিন পরিবারসহ ওঠেন সেখানে।

house-change-2.jpg

এ বিষয়ে তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘কী আর করা, গত চার মাস বেতন অনিয়মিত। মাস শেষে বেতন হয় না। কিন্তু বাড়িওয়ালা তো মাসের প্রথমেই ভাড়া চান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গত তিন মাস ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেতন কম দিয়েছে। চলতি মাসের বেতনের যে কী হবে, জানি না। গত ঈদে বোনাসও পাইনি। তাই সংসারের খরচ কমানোর পাশাপশি বাসা ভাড়াটাও চার হাজার কমিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে কিছুই করার নেই। আমরা তো আর বেতন-ভাতার জন্য রাস্তায় নামতে পারব না। এখন আগামীতে যদি পরিস্থিতির উন্নতি হয়, সেই আশায় রয়েছি।’

টালি অফিস রোডের বাড়ির মালিক জাহিদ আলম বলেন, ‘আমাদের চার ভাই-বোনের এ এলাকায় ছোট-বড় সাতটা বাড়ি আছে। সব বাড়িতে ভাড়াটিয়া আছেন। আমাদের ভাড়াটিয়ারা করোনার কারণে অর্থাভাবে গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন, এমনটি ঘটেনি। তবে তিনটা পরিবার বেশি ভাড়ার ফ্ল্যাট ছেড়ে কম ভাড়ার ফ্ল্যাটে চলে গেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগে নিয়মিত সবাই ভাড়া পরিশোধ করতেন। কিন্তু এখন ভাড়া দিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। আগে যারা ১০ তারিখের আগেই ভাড়া দিতেন এখন মাসের শেষেও দিতে পারছেন না। আয় কমে গেছে, আমরাও কিছু বলতে পারছি না। আবার আমরা যে ভাড়া নেব না, সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, আমাদের আয়ের তেমন কোনো পথও নেই।’

house-change-2.jpg

শুধু তৌহিদুর রহমানই নন, করোনার পরিস্থিতিতে অর্থের সংস্থান করতে না পেরে অনেকে বেছে নিয়েছেন বাসা পাল্টানোর পথ। আবার একই কারণে চাকরি বা ব্যবসা হারিয়ে অনেককে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে হচ্ছে। ঢাকায় তাদের এখন আর কোনো কাজ নেই, বেতন নেই, আগের মতো ব্যবসাও নেই। তাই তাদের আশ্রয়ও নেই এখানে। যে কারণে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়ে ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছেন তারা।

ঢাকাসহ সারাদেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার দুই হাজার ৩৭১ জনের সাক্ষাৎকার নিয়ে ব্র্যাক গত মে মাসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, ৩৬ শতাংশ লোক চাকরি বা কাজের সুযোগ হারিয়েছেন। ৩ শতাংশ লোকের চাকরি থাকলেও বেতন পাননি। আর দৈনিক মজুরিভিত্তিতে যারা কাজ করেন, তাদের ৬২ ভাগই কাজের সুযোগ হারিয়েছেন। করোনার কারণে ১০টি জেলার মানুষের আয় কমে গেছে। ঢাকা জেলার মানুষের আয় কমেছে ৬০ ভাগ।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের রিপোর্ট অনুযায়ী, ঢাকার ৯০ শতাংশ বাসিন্দা ভাড়া বাড়িতে থাকেন। রিপোর্টে দেখা যায়, ২০০৯ সালে দুটো শোবার ঘর সমৃদ্ধ যে বাড়ির ভাড়া ছিল গড়ে ১০ হাজার ৮০০ টাকা, সেই একই বাড়ির গড় ভাড়া ২০১৬ সালে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৭০০ টাকায়। এই হিসাবে উল্লেখ্য যে, এক দশকের কম সময়ে ঢাকায় সাধারণ মানুষের বাসযোগ্য বাড়ির ভাড়া ৮২.৪ শতাংশ বেড়ে গেছে। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে আয় সংকোচিত হওয়ায় ব্যয়ের হিসাবটাও কমিয়ে আনতে হচ্ছে। এ কারণে কম টাকার বাসা ভাড়ার খোঁজে অধিকাংশ ভাড়াটিয়া।

এমইউএইচ/জেডএ/এমএআর/এমএস


Smiley face