ইন্টারনেট সংযোগ হঠাৎ হঠাৎ বিচ্ছিন্ন, বিপাকে শিক্ষার্থীরা

4
Smiley face

ধানমন্ডি ১১ নম্বর সড়কের বাসিন্দা জাকির হোসেনের তিন সন্তানই অনলাইন ক্লাস করছে। কয়েক দিন আগে হঠাৎ বাসার ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিপাকে পড়ে সন্তানেরা। তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ইন্টারনেট ও ডিশ সংযোগের তার কেটে দিয়েছে।

জাকির হোসেনের মতো অনেকেই এখন এমন সমস্যায় পড়ছেন। করোনাকালে অনলাইন ক্লাস ও পরীক্ষা, অফিসের কাজ, ভার্চ্যুয়াল সভা, কেনাকাটাসহ নানা কারণে উচ্চগতির ইন্টারনেটের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা বেড়েছে। কিন্তু কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না রেখে প্রায়ই ইন্টারনেট সংযোগ কেটে দেওয়ায় মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে।গত আগস্ট থেকে সড়কে মাথার ওপর ঝুলে থাকা সব তার অপসারণে অভিযান শুরু করেছে ডিএসসিসি। অভিযান এখনো চলছে। সংস্থাটি বলছে, দক্ষিণ সিটি এলাকায় ব্যবসা করতে হলে করপোরেশনের লিখিত অনুমতি নিতে হবে। কিন্তু কেউ করপোরেশন থেকে অনুমতি নেয়নি। এ ছাড়া মাটির নিচ দিয়ে এসব সংযোগ থাকার কথা থাকলেও যত্রতত্র মাথার ওপর দিয়ে কেব্‌ল টানা হচ্ছে। এতে নগরীর সৌন্দর্য বিনষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জনজীবনে ঝুঁকি বাড়ছে।অবশ্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় কেব্‌ল অপসারণে অভিযান নেই। উত্তরের মেয়রের ঘোষণার পর সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা থেকে মাটির নিচ দিয়ে সংযোগ নিচ্ছে।ব্যবসা বৈধ না অবৈধ, সংযোগের তার মাটির নিচ দিয়ে নাকি ওপর দিয়ে যাবে, এসব ভাবতে নারাজ নয়াপল্টনের বাসিন্দা মো. রুবেল। তিনি বলেন, শুধু শিক্ষার্থীদের ক্লাসে অংশ নেওয়ার জন্যই নয়, ব্যবসা–বাণিজ্য এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের ক্ষেত্রেও ইন্টারনেটের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে গেছে। তাই দ্রুত একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।মাটির নিচ দিয়ে সংযোগ তার সঞ্চালন করে সেটা গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর দুটি ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপটি ন্যাশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন টেনওয়ার্ক বা এনটিটিএন অপারেটরদের। এরা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) লাইসেন্সপ্রাপ্ত।তারা মাটির নিচ দিয়ে অপটিক্যাল ফাইবারের সংযোগ সঞ্চালন করে এবং প্রতিটি ভবনে বিতরণ কেন্দ্র বা ডিস্ট্রিবিউশন পয়েন্ট স্থাপন করে। দ্বিতীয় ধাপে ইন্টারনেট ও ডিশ সংযোগ সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এনটিটিএন অপারেটরদের বিতরণ কেন্দ্র থেকে সংযোগ নিয়ে সেটি গ্রাহকদের ঘরে ঘরে পৌঁছায়।কিন্তু ইন্টারনেট ও ডিশ সেবা সরবরাহকারীদের সংগঠন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) ও কেব্‌ল অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অববাংলাদেশের (কোয়াব) নেতারা বলছেন, পুরো শহরে মাটির নিচে ভূগর্ভস্থ সংযোগ করা হয়েছে বলে এনটিটিএন অপারেটররা দাবি করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। বড় সড়কে এনটিটিএনের অবকাঠামো থাকলেও বাসাবাড়ি পর্যন্ত এসব বিতরণ কেন্দ্র নেই। তাই চাইলেও মাটির নিচ দিয়ে সব গ্রাহকের সংযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।আইএসপিএবির সভাপতি এম এ হাকিম প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন সভায় এনটিটিএন অপারেটররা দাবি করেন যে তাঁরা প্রতিটি বাড়িতে বিতরণ কেন্দ্র স্থাপন করেছেন। কিন্তু সম্প্রতি গুলশান ও বনানী এলাকায় ৪৫টি বাড়ি পরিদর্শন করে কেবল দুটি বাড়িতে বিতরণ কেন্দ্র পাওয়া গেছে।করোনাকালে শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস করছে। এমন পরিস্থিতিতে কেব্‌ল কেটে দেওয়া কতটা যৌক্তিক, এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ভোগান্তি কমানোর জন্যই তাঁরা উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছেন। কেব্‌ল সংযোগ ছাড়াও বিকল্প হিসেবে মোবাইল ডেটা দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ আছে।ঢাকা দক্ষিণে গত ৫ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া অভিযান এখনো চলছে। গতকাল পর্যন্ত তারা ধানমন্ডি, বেইলি রোড, শান্তিনগর, হাতিরপুল, সেগুনবাগিচা, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, নয়াপল্টন, কাকরাইলসহ ৪৮টি এলাকায় অভিযান চালিয়েছে। এসব এলাকায় ২৮৫টি বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে তার অপসারণ করা হয়েছে।

গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে আইএসপিএবির প্রতিনিধিরা দক্ষিণের মেয়রের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কিন্তু এতে কোনো সমাধান আসেনি। এ প্রসঙ্গে এম এ হাকিম প্রথম আলোকে বলেন, মেয়রের কথা একটাই—মাটির নিচ দিয়ে কেব্‌ল যেতে হবে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যবসা করতে হলে অবশ্যই নিবন্ধন করতে হবে। কিন্তু নিবন্ধন করলেও এই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। কারণ, বর্তমানে মাটির নিচ দিয়ে যে ব্যবস্থাপনা আছে, তাতে মাথার ওপর দিয়ে কেব্‌ল টানতে হবেই। এই সমস্যার সমাধান জরুরি।এই বিষয়ে ডিএসসিসির মুখপাত্র মো. আবু নাছের প্রথম আলোকে বলেন, মাথার ওপর ঝুঁকিপূর্ণভাবে কোনো কেব্‌ল থাকবে না, অবৈধ সংযোগ থাকবে না, এটাই সিদ্ধান্ত। মাটির নিচে সংযোগ সঞ্চালনের বিদ্যমান যে অবকাঠামো আছে, সেটি এখন পর্যন্ত কোনো আইএসপিএবি ব্যবহার করছে না। তারা যদি সেগুলো ব্যবহার করত, তাহলে হয়তো বলা যেত যে কেব্‌লের জঞ্জালকে শৃঙ্খলায় আনতে প্রতিষ্ঠানগুলোর সদিচ্ছা আছে।দক্ষিণের মতো উত্তর সিটিতে কেব্‌ল কাটাকাটির তেমন বিড়ম্বনা নেই। ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহ. আমিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, উত্তর সিটিতে সেবাদাতাদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদেরকেই ঝুলন্ত কেব্‌ল অপসারণ করে নিতে বলা হচ্ছে। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের নালা দিয়ে সংযোগ নেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।তবে উত্তরা এলাকায় কেব্‌ল মাটির নিচে স্থানান্তর করতে গিয়ে সেখানকার বাসিন্দাদের বিপাকে পড়তে হয়েছে। অনেকের সংযোগ এক থেকে তিন দিন পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন ছিল। এ সময় ইন্টারনেট-ডিশ কিছুই ছিল না। ৪ নম্বর সেক্টরের ৩ নম্বর সড়কের বাসিন্দা শারমিন আক্তার জানান, ২৮ সেপ্টেম্বর হুট করেই ডিশের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিন দিন পর তিনি সংযোগ পান। ৮ নম্বর সড়কের বাসিন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিমন আহমেদ বলেন, অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে তাঁর বাসায় পুরো এক দিন ইন্টারনেটের সংযোগ ছিল না।

টেলিযোগাযোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার সিনিয়র পলিসি ফেলো আবু সাইদ খানের মতে, এখন পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ কেব্‌ল সংযোগ স্থাপন করতে না পারাটা এনটিটিএন অপারেটরদের ব্যর্থতা। তারা তাদের নেটওয়ার্ক কার্যকরভাবে স্থাপন করতে পারেনি। তিনি বলেন, রাতারাতি কেব্‌ল কেটে ফেলা খুব সহজ। কিন্তু রাতারাতি সমস্যার সমাধান করা সহজ নয়। সিটি করপোরেশন নিজেই অপটিক্যাল ফাইবার কেব্‌ল স্থাপন করতে পারে। যেটা উন্নত দেশের অনেক সিটি করপোরেশন করে থাকে।

সূত্র:প্রথম আলো

Smiley face