করোনা থেকে তরুণদের স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে

20
Smiley face

করোনা সাধারণভাবে ফুসফুসের ইনফেকশন মনে হলেও, কোভিড- ১৯ রক্তনালিতে রক্ত জমাট বাঁধার জন্য দায়ী যা মারাত্মক স্ট্রোক ঘটায়।

স্ট্রোক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেন, উপসর্গহীন করোনায় আক্রান্ত তরুণদের অর্ধেকই ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হতে পারেন।

৩০ বছর বয়স্ক মৃদু করোনা উপসর্গ নিয়ে রোগীরা স্ট্রোক হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।

সম্প্রতি আমেরিকান নিউরোলজি একাডেমির প্রকাশিত নিউরোলজি জার্নালে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত তরুণ রোগীদের মধ্যে স্ট্রোকের হার ও ব্যাপকতা নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। করোনায় আক্রান্ত তরুণদের মধ্যে মেজর স্ট্রোকের হার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মেটা অ্যানালাইসিসে উঠে এসেছে আরও ভয়ংকর উপাত্ত- করোনার ফলে স্ট্রোকে আক্রান্ত তরুণদের শতকরা ৫০ ভাগ রোগী স্ট্রোকের লক্ষণ প্রকাশিত হওয়ার সময়েও জ্বর-কাশি শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি উপসর্গহীন ছিলেন।

এ গবেষণাপত্রের লেখক, কানাডার স্কুলিস স্কুল অব মেডিসিন ও ডেন্টিস্ট্রিয়ের প্রধান স্ট্রোক বিজ্ঞানী ডা লুসিয়ানো স্পোসাটো আশঙ্কা প্রকাশ করেন, তরুণদের ক্ষেত্রে স্ট্রোক কোভিড-১৯ সংক্রমণের প্রথম লক্ষণ হিসেবে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

গত এপ্রিল মাসেই স্পোসাটো করোনাকে শুধু শ্বসনতন্ত্রের রোগ নয় বলে মন্তব্য করে ব্যাপক সাড়া ফেলেন। তিনি বলেন কোভিড-১৯-এর প্রভাবে রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে ব্লক হয়ে যায় যা ৮৭ ভাগ স্ট্রোকের জন্য দায়ী।

কানাডা, আমেরিকা ও ইরানের ১০টি গবেষণাপত্র ও ৩৫টি অপ্রকাশিত কেস রিপোর্টসহ ১৬০ জন রোগীর উপসর্গ ও রিপোর্টের সমন্বয়ে একটি সিস্টেমেটিক রিভিউ পরিচালনা করা হয়। এ গবেষণায় প্রত্যেক রোগীর বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয় যা করোনার ভয়াবহতা বুঝতে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের নতুন জানালা উন্মোচন করেছে।

নিউইয়র্কের প্রেসবাইটেরিয়ান হাসপাতাল ও উইল কর্নেল হাসপাতাল সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা ও কোভিড-১৯-এর মধ্যে তুলনামূলক কো হর্ট গবেষণা পরিচালনা করে। করোনায় আক্রান্ত তরুণদের একিউট ইসকেমিক স্ট্রোকের হার বহুগুণ বেশি।

ডা. আলেকজান্ডার মার্কলার ও তার দল জার্নাল অব আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক প্রকাশিত নিউরোলজি জার্নাল এ চিকিৎসকদের জন্য অ্যালার্মিং উপাত্ত তুলে ধরেন। ঐতিহাসিক এই গবেষণায় ১৯১৬ জন করোনা রোগী ও ১৪৮৬ জন ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগী অংশগ্রহণ করেন।

একিউট স্ট্রোকের লক্ষণ (BE FAST) দেখা মাত্রই সময় নির্ভর ইন্টারভেনশন ও সার্জারি (থ্রোম্বেক্টমি ও থ্রোম্বোলাইসিস) করে মৃত্যু ও প্যারালাইসিস রুখতে নিউরোসার্জনদের সতর্ক করেন। দ্রুত CT SCAN ও পরীক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে এখানে আলোকপাত করা হয়। এছাড়াও রক্তে ডি ডাইমার পরীক্ষার মাধ্যমে স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের আলাদা যত্ন নেয়া সম্ভব।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্ট্রোক বিশেষজ্ঞ ও এন্ডোভাস্কুলার নিউরোসার্জন ডা. মো. শফিকুল ইসলাম করোনায় স্ট্রোকের হার বৃদ্ধি সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদান করেন- করোনাভাইরাস রক্তনালিতে ছোট ছোট মাইক্রোথ্রম্বি বা রক্তের দলা সৃষ্টি করে, রক্তনালির দেয়ালে প্রদাহ তৈরি করে যা আবার চক্রবৃদ্ধিহারে বৃহদাকার রক্তের দলা বা ক্লট জমাট বাঁধতে সাহায্য করে।

এই ক্লট ফুসফুসে গেলে মারাত্মক পালমোনারি অ্যাম্বোলিজম দেখা দেয়- বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট হয়ে রোগীরা হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেন। তেমনিভাবে যে কোনো বয়সী মানুষের মস্তিষ্কের রক্তনালিতে এই ক্লট জমাট বাঁধলে ভেনাস সাইনাস থ্রোম্বোসিসসহ বড় রক্তনালির ব্লক হয়ে ব্রেন স্ট্রোক হতে পারে। সাড়ে চার ঘণ্টায় বা গোল্ডেন অ্যাওয়ারের মধ্যে থ্রোম্বোলাইসিস বা থ্রোম্বোক্টমি করলে রোগীরা সম্পূর্ণ সুস্থ হতে পারেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সম্প্রতি এই সেবা চালু হয়েছে।

করোনায় আক্রান্তদের ক্ষেত্রে মৃদু স্ট্রোকও সতর্কতার সঙ্গে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা না করলে জীবনসংহারী ফলাফল ঘটতে পারে।

হঠাৎ কথা জড়িয়ে যাওয়া, হাত-পায়ে অসাড়তা দেখা দিলে, চোখে ঝাপসা দেখলে বা তীব্র মাথা ব্যথা হলে দ্রুত নিউরোসার্জন ও স্ট্রোক বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের করোনায় আক্রান্ত স্ট্রোক রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। মহামারীতে যেন আর কোনো তরুণ জীবন স্ট্রোকের কবলে মারা না যায় বা প্যারালাইসিসে না ভোগে সবার এই বিষয়ে সচেতনতা ও সহযোগিতা কাম্য।

লেখক : পোস্ট গ্রাজুয়েট ট্রেইনি, নিউরোসার্জারি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল


Smiley face