উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়েরই

12
Smiley face

সম্প্রতি আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, ‘চলমান করোনার কারণে যদি খাদ্য সংকট বা দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তাহলে আমাদের হাতে টাকা থাকলেও খাদ্য পাওয়া কঠিন হবে, অনেক ক্ষেত্রে পাওয়াই যাবে না।’ এ বক্তব্যের মাধ্যমে মন্ত্রী বিদ্যমান সংকটজনক বৈশ্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। ২০০৭-০৮ সালের বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের শিক্ষা সবার মনে থাকার কথা।

 ভিয়েতনাম, ভারত, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ডসহ খাদ্য উদ্বৃত্ত দেশগুলো অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে রফতানি বন্ধ করে দেয়। সে সময় অর্থ ব্যয় করেও বিশ্ববাজার থেকে খাদ্য সংগ্রহ করতে পারেনি বাংলাদেশ ২০২০ সালে এসেও বিশ্বে খাদ্য উৎপাদন হ্রাসের আভাস মিলছে। এরই মধ্যে বৈশ্বিক খাদ্যবাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। নিজস্ব খাদ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কৃষিপণ্য রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে রাশিয়া, থাইল্যান্ড,কম্বোডিয়াসহ ১০টির বেশি দেশ। এর প্রভাবে বৈশ্বিক খাদ্যশস্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একদিকে দাম বাড়ছে, অন্যদিকে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মিলছে না। এক্ষেত্রে অর্থ দিয়েও খাদ্য আমদানি সম্ভব নাও হতে পারে। এ অবস্থায় নিজেদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য বাংলাদেশকে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান খাদ্য সংগ্রহ, গুদামজাত ও বণ্টন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণের বিকল্প নেই।

 

ধান উৎপাদনের পাশাপাশি সর্বোচ্চ চাল প্রাপ্তিও নিশ্চিত করতে হবে চালকলগুলো থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা মিলছে না। এর কারণ হিসেবে ধানের আর্দ্রতার তারতম্য ও পরিপক্ক হওয়ার আগে ফসল তোলাকে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ফসল রক্ষায় অপরিপক্ক ফসল তোলা হয়, এতে ধান থেকে চাল প্রাপ্তি কমে যায়। ধান সেদ্ধ করা থেকে শুকানো ও চাল তৈরির প্রতিটি প্রক্রিয়ায় সঠিক আর্দ্রতা বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থাকে। তাছাড়া চাল ছোট করতে গিয়ে অপচয়ও হচ্ছে। দেশের আধুনিক চালকল থেকেও কেন প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের মতো উৎপাদন হচ্ছে না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একরপ্রতি উৎপাদন বৃদ্ধি ও ফসলোত্তর অপচয় রোধ করতে হবে।

খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি খাদ্যের লভ্যতা ও প্রাপ্তির বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যলভ্যতা প্রধানত অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, বাণিজ্য ও মজুদের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুর যেমন তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই বিশ্বের প্রায় ১৭০টি ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্র থেকে আমদানি করে। কিন্তু খাদ্য বণ্টন ব্যবস্থায় যাতে কোনো ধরনের অসংগতি তৈরি না হয় সেজন্য সরকারের ফুড এজেন্সি কর্তৃপক্ষ সার্বিকভাবে বিষয়গুলো নজরদারি করে। অভ্যন্তরীণ বণ্টন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে দাম নির্ধারণ করে দেয়া হয় এবং বণ্টন ব্যবস্থা এমনভাবে করা হয় যাতে ক্রয়ক্ষমতা জনগণের হাতেই থাকে। কভিডকালীন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকেও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি বণ্টন ব্যবস্থার দিকে নজর দিতে হবে। বেশ কিছুদিন ধরেই দেশে চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী। বন্যার কারণে ধান উৎপাদন কম হয়েছে। এ অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকে ন্যায্যমূল্যে প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম বাড়াতে হবে। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য পরিবহন ও বিক্রয় নিশ্চিত করা, বিক্রেতার সঙ্গে ভোক্তার সংযোগ স্থাপনে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য হ্রাস করা জরুরি। নিশ্চিত করতে হবে বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও পণ্যের ন্যায্যমূল্যও।

উচ্চফলন ও লাভজনক লাগসই নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও অবলম্বনের মাধ্যমে কৃষিতে অর্জিত সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষাকল্পে টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে ছোট ছোট খামারভিত্তিক চাষাবাদের কারণে প্রায়ই জমিতে উন্নত যন্ত্র ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে সমবায়ের ভিত্তিতে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি ছোট খামার উপযোগী যন্ত্র উদ্ভাবন করতে হবে। টেকসই কৃষি ব্যবস্থায় চাষাবাদের সঙ্গে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অন্য দিকগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। টেকসই কৃষি এমনভাবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতে হবে যেন তা সম্পদ সাশ্রয়ী, সামাজিকভাবে সহায়ক, বাণিজ্যিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশবান্ধব হয়। টেকসই খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা অর্জনে সুষম ও টেকসই মাটি ব্যবস্থাপনা আবশ্যক। স্বল্প উপকরণ সহায়তার মাধ্যমে অধিকতর খাদ্য উৎপাদন কৌশল বের করতে হবে। একই সঙ্গে খাদ্যশস্যের অপচয় ও বিনষ্ট হওয়া থেকে রক্ষায় কার্যকর মজুদ ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে গুদামের নিম্নমানের পরিবেশের কারণে পোকার আক্রমণে খাদ্যশস্য নষ্ট হয়। গুদামের পরিবেশের উন্নতি করতে হবে। রিমোট সেন্সিং টুল ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন ও ফসলের ক্ষতিবিষয়ক গবেষণা জোরদার করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার ফসল ও ফসল উত্তোলন-পরবর্তী ক্ষতি কমায়, উৎপাদন ব্যয় ও খাটুনি কমায়, উচ্চমানসম্মত পণ্য উৎপাদনে দ্রুততম ও সময়ানুগ পরিচালনা নিশ্চিত করে।

খাদ্য উৎপাদনের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে বিবেচনায় রেখে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার ও সংরক্ষণ অতি গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন কার্যক্রমে অর্থনৈতিক, পরিবেশগত, সামাজিক এ বিষয়গুলো সমন্বয়ের মাধ্যমে ভূমি ব্যবহারের সমন্বিত পরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন। খামার থেকে ভোক্তা পর্যায়ে কৃষিপণ্যের যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিত করার জন্য কৃষি বিপণনের সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

বিশ্বে করোনাভাইরাসের প্রভাবে বড় আকারের দুর্ভিক্ষ হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি। খাদ্যসমৃদ্ধ দেশগুলোতেও খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে দেশের অনাবাদি জমি আবাদের আওতায় আনার পাশাপাশি বাজার অবকাঠামো, ফসল সংরক্ষণাগার, বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজ সম্প্রসারণ ও কৃষিপণ্য সংরক্ষণ নিশ্চিতের মাধ্যমে উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে হাওড়াঞ্চলসহ অন্যান্য অঞ্চলের কৃষকের জন্য বীজ, সার, সেচের মতো প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ সরবরাহ ও ভর্তুকি মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি পৌঁছানো নিশ্চিত করে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের পরিমাণ বাড়াতে হবে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় চাহিদাভিত্তিক কৃষিপণ্য উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করে একটি টেকসই কৃষি কাঠামো গড়ে তুলতে মনোযোগী হতে হবে।


Smiley face