জলবায়ু পরিবর্তন আর বাঘের শিকার যে জীবন

15
Smiley face

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ছে৷ সুন্দরবন অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার মানুষ তাই বাধ্য হচ্ছেন জীবিকার সন্ধানে বনের গভীরে যেতে৷ কিন্তু সেখানে আছে বাঘের ভয়৷

প্রাকৃতিক দুর্যোগ

এনভায়রনমেন্ট, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুন্দরবনের ভারতীয় অংশে ক্রান্তীয় ঝড়ের সংখ্যা ২৬ শতাংশ বেড়েছে৷ গত বছরের মে মাসে সাইক্লোন আমপান ঘণ্টায় ১৩৩ কিলোমিটার বেগের বাতাস নিয়ে সুন্দরবনে আছড়ে পড়ে৷ প্রাণ হারান বহু মানুষ৷ কয়েক হাজার বাড়িঘর ও বাঁধ ধ্বংস হয়ে যায়৷ এমন একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হচ্ছেন এ অঞ্চলের মানুষ৷

পানির নিচে ধানক্ষেত

অক্টোবরে নোনা পানিতে প্লাবিত হয়ে গেছে কুমিরমারি দ্বীপের বাসিন্দা নাগিন মুন্ডার আধা একরের ধানক্ষেত৷ ‘‘আমার পুকুরে কোনো মাছ নেই, বাগানে কোনো সবজি নেই; আর আমার ধানের ফসল অর্ধেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে,’’ বলেন ৫০ বছর বয়সি এ কৃষক৷

১৫ শতাংশ জমি

গত বছর কুমিরমারির প্রায় আড়াইশ একর কৃষিজমি প্লাবিত হয়েছে৷ এতে দেড় হাজারের বেশি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার স্থানীয় কর্মকর্তা দেবাশীষ মন্ডল৷ তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে কুমিরমারির আনুমানিক এক হাজার একর জমি মুছে গেছে, যা দ্বীপটির মোট ভূখণ্ডের ১৫ শতাংশেরও বেশি৷ এর ফলে কৃষি জমি আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে৷

বাঘের খাদ্য

চার বছর আগে সুন্দরবনের গভীরে মাছ ধরতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি পারুল হালদারের স্বামী৷ মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের শিকার হয়েছেন তিনি৷ চার সন্তানের ভরণপোষণের ভার পুরোটাই এখন পারুলের কাঁধে৷

বাড়ছে মৃত্যু

৭৮ বছরের সুভদ্রা হালদারের স্বামীও মারা গেছেন বাঘের হামলায়৷ সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের পরিচালক তাপস দাস বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, সুন্দররনের ভারত অংশে গত বছরের এপ্রিল থেকে বাঘের হামলায় অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে৷ স্থানীয় গণমাধ্যমের হিসাবে, গত বছর বাঘের আক্রমণে মৃত্যু হয়েছে মোট ২১ জনের৷ আগের দুই বছর এই সংখ্যা ছিল ১৩৷ প্রকৃত সংখ্যাটা হয়ত তার চেয়েও বেশি৷

পারুলের সংগ্রাম

স্বামীর পরিণতির কথা জেনেও জীবিকার সন্ধানে নিয়মিত সুন্দরবনের গভীরে যেতে হয় ৩৯ বছরের পারুলকে৷ মাসে দুইবার তিনি ছয় ঘণ্টা নৌকা চালিয়ে যান সুন্দরবনের গভীরে৷ মৃত্যুর শঙ্কা নিয়েও কয়েকদিন তাকে থাকতে হয় বনের ভিতরে৷ মাছ আর কাঁকড়া ধরে মাসে দুই হাজার রূপি আয় হয় তার৷ ‘‘যদি আমি জঙ্গলে না যাই, তাহলে খাবারও জুটবে না,’’ বলেন পারুল৷

মেয়ের জন্য

১১ বছর বয়সি পাপড়ির জন্যই কাজের খোঁজে অন্য কোথাও যেতে চান না পারুল৷ কারণ তিনি না থাকলে সন্তানের যত্ন নেবে এমন কেউ পরিবারে কেউ নেই৷ ‘‘যত কষ্টই হোক না কেন, আমি ওকে পড়াবোই’’, বলেন তিনি৷

করোনা ও হরিপদের নির্মম ভাগ্য

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সুন্দরবনে গিয়ে আর ফেরেননি ৩১ বছরের হরিপদ মণ্ডল৷ কুমিরমারির বাসিন্দারা একটি গাছের নিচে তার একজোড়া মোজা দেখতে পান৷ পরে তার দেহাবশেষ খুঁজে পান তারা৷ ‘‘তিনি (হরিপদ) বলেছিলেন কাছাকাছি কোথাও মাছ ধরে ৫০-১০০ রুপি পেলে তা দিয়ে ঘরের খরচ মেটাবেন৷ যদি লকডাউন বা করোনা ভাইরাস না থাকতো, তিনি হয়তো কাজেই থাকতেন,’’ বলেন ২৯ বছর বয়সি অষ্টমী৷

 


Smiley face