বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীতেই মৈত্রী সেতু উদ্বোধনের সম্ভাবনা

21
Smiley face

২০১৭ সালের ২৭ অক্টোবর থেকে মৈত্রী সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। সেতুর কাজ শেষ হয়েছে, এখন কেবল উদ্বোধনের পালা। সেই প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন রামগড় ও সাবরুমবাসী।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং মুজিববর্ষ পালনে ব্যাপক আয়োজন চলছে বাংলাদেশে। সঙ্গে রয়েছে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পালন। সব কিছু ঠিকঠাক চললে এবং পরিবেশ অনুকূল থাকলে বাংলাদেশের মহোৎসবে শামিল হওয়ার কথা রয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-সহ বিশ্বনেতাদের।

মুজিববর্ষে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নানামুখী প্রকল্প ও কানেক্টিভিটি চলমান রয়েছে। দেশটির বিজয় দিবসের রেশ ধরে ১৭ ডিসেম্বর শুরু হয় চিলাহাটি-হলদিবাড়ি পণ্যবাহী রেলচলাচল। ৫৫ বছর পর। আসছে ২৬ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে চালু হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ-শিলিগুড়ি যাত্রীবাহী ট্রেন। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে স্মরণীয় করে রাখতে একের পর এক রেলপথ, জলপথ, সড়কপথ চালু হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ফেণী নদীর ওপরে নির্মিত বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী-১ সেতুটির উদ্বোধনের ঘণ্টায় বেজে যেতে পারে মুজিববর্ষ ও সুবর্ণজয়ন্তীতেই।

মৈত্রী সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ

মৈত্রী সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ। এখন রংতুলির শেষ আঁচড় পড়ছে। বাংলাদেশের রামগড় পৌরসভার মহামুনি প্রান্ত থেকে ত্রিপুরার সাব্রুমের আনন্দপাড়া যেন আগলে রেখেছে মৈত্রী সেতুকে। অর্থনৈতিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও মজবুত করতে এই সেতুটির মাধ্যমে লালসবুজ ও তেরঙা পতাকার সম্মিলন ঘটতে যাচ্ছে মুজিববর্ষেই।

বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় তথা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পালন উৎসবেই বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু-১ দ্বারোদঘাটনের সম্ভাবনার ইঙ্গিত মেলে। মুজিববর্ষেই বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে কানেক্টিভিটি নেটওয়ার্কের আওতায় চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেলপথে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। চালু হয়েছে বাংলাদেশের দাউদকান্দি-ত্রিপুরার সোনামুড়া জলপথ। উত্তরের পথে মেঘনার বুক চিরে অসমের করিমগঞ্জে লালসবুজ-গেরুয়া পতাকা উড়িয়ে পণ্যবাহী জলযান গিয়েছে। চলতি বছরেই আখাউড়া-আগরতলা রেলপথের কাজ সম্পন্ন হবে। জোরকদমে এগিয়ে চলছে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেপথের কাজ। যেটি সরাসরি অসমের মহিষাসনের সঙ্গে যুক্ত হবে।

ভারত বাংলাদেশের পারস্পরিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে এ বার সেতুবন্ধনে আবদ্ধ হতে চলেছে রামগড়-সাবরুম মৈত্রী সেতু। বাংলাদেশের পাঁজরঘেষা উত্তরপূর্ব ভারতের রাজ্যটির নাম ত্রিপুরা। অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে থাকা রাজ্যটির সঙ্গে চলতি বছরেই চালু হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু। উভয় দেশের প্রাধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সেতুর উদ্বোধন করবেন। এ নিয়ে ঊভয়দেশের উচ্চ পর্যায়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে গিয়েছে।

রামগড় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কী বলেন

রামগড় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বিশ্বপ্রদীপ কুমার কারবারী  বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরত্ব থাকায় পণ্যবাহী লরি ত্রিপুরায় পৌঁছাতে সময় লাগবে সর্বোচ্চ ৫ ঘন্টা। এই সাশ্রয়ী পণ্যপরিবহনের সুযোগ ভোগ করবে উত্তরপূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর সাধারণ বাসিন্দা। পাশাপাশি দু’ দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রসারও ঘটবে। সুগম হবে দু’দেশের আর্থসামাজিক সম্পর্ক। সেতুটি ঘিরে এরই মধ্যে ত্রিপুরার সাবরুম এলাকায় গড়ে ওঠছে অর্থনৈতিক জোন। সেতুটির ৮০ শতাংশ পড়েছে বাংলাদেশ প্রান্তে।

বিশ্বপ্রদীপ আরও জানালেন, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম গড়ে উঠতে যাচ্ছে অর্থনৈতিক হাব হিসেবে। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, বে-টার্মিনাল, মেরিন ড্রাইভ মহাসড়ক, এ সব গড়ে ওঠার সুবিধাভোগী হবে উত্তরপূর্ব ভারতের রাজ্যগুলো। কারণ এখান থেকে দিনে দিনে পণ্য পরিবাহিত হতে পারবে রাজ্যগুলোতে। তাতে ভারতের পিছিয়ে পড়া রাজ্যগুলোর অর্থনৈতিক সুবিধা হবে। পাশাপাশি মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর সিঙ্গাপুর থেকে কাছে হওয়ায় তা ব্যবহার করতে পারবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও অন্য রাজ্যগুলো। অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে শেখ হাসিনার হাত ধরেই।

বিশ্বপ্রদীপ জানান, পদ্মাসেতু হওয়ার ফলে বাংলাদেশের মংলা বন্দর ব্যবহার করে উত্তরপূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে পণ্যপরিবহনের ক্ষেত্র এখন অনেক সহজ হবে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা না হলে বাংলাদেশে কোনো দিন পদ্মাসেতু হত বলে মনে হয় না।

রামগড় পৌরসভার মেয়র কী বলেন

রামগড় পৌরসভার মেয়র মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, রামগড়ে মৈত্রীসেতু ঘিরে এখানে গড়ে উঠছে স্থলবন্দর। এতে করে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছোঁয়া লাগবে পাহাড়ে। আয় বাড়বে পৌরসভারও। কানেক্টিভিটি হচ্ছে সভ্যতার প্রতীক এ কথা উল্লেখ মেয়র বলেন, বাংলাদেশকে ব্যবহার করলে ভারতের উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলোতে পণ্যপরিবহন সাশ্রয়ী হবে। সব মিলিয়ে আগামী দিনে রামগড়কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য যে পাখনা মেলবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ জন্য রামগড়বাসীর তরফে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে অভিনন্দন জানান।

সরেজমিন রামগড় ঘুরে দেখা গেল সেতুটি চালুর অপেক্ষায় দিন গুণছেন রামগড় তথা পাশ্ববর্তী এলাকার সাধারণ মানুষ। সেতুকে ঘিরে সকলেই আবেগাপ্লুত। এরই মধ্যে গত ৬ জানুয়ারি জাপান উন্নয়ন সংস্থার (জাইকা) প্রতিনিধি দল মৈত্রী সেতুসহ সড়কে নির্মীয়মাণ সেতু-কালভার্ট পরিদর্শন করেন। এর আগে গত ৩০ ডিসেম্বর পরিদর্শন করে গেছেন ত্রিপুরায় নিযুক্ত বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনার মো. জাবেদ হোসেন।

সেতু নির্মাণের দায়িত্বে এনএইচআইডিসিএল

ভারতের ন্যাশনাল হাইওয়েস অ্যান্ড ইনফ্রাস্টাকচার ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন লিমিটেড (এনএইচআইডিসিএল) এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তানিশ চন্দ্র আগারভাগ ইনপাকন প্রাইভেট লিমিটেডের তত্ত্বাবধানে ৮২.৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে রামগড়ের মহামুনিতে ২৮৬ একর জমির ওপর ৪১২ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৪.৮০ মিটার প্রস্থের আন্তর্জাতিক মানের মৈত্রী সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ১২টি পিলার সংবলিত সেতুটির বাংলাদেশ অংশে নির্মাণ করা হয়েছে আটটি এবং ভারতের অংশে চারটি পিলার। যাতে স্প্যান রয়েছে ১১টি। এর বাংলাদেশ অংশে সাতটি ও ভারত অংশে চারটি। নদীর অংশে ৮০ মিটারের স্প্যান এবং নদীর দু’পাড়ের ৫০ মিটারের দুটিসহ মোট ১৮০ মিটার দৈর্ঘ্যের এ তিনটি স্প্যানই হচ্ছে সেতুর মেন স্প্যান।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি সফরকালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে রামগড়-সাবরুম স্থলবন্দর চালুর যৌথ সিদ্ধান্তের পর বাংলাদেশ-ভারত দু’দেশের মধ্যে ট্রানজিট সুবিধা, যাতায়াত ব্যবস্থা সহজতর করা এবং আমদানি-রফতানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৫ সালের ৬ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু-১ নামে ফেনী নদীর ওপর নির্মিত সেতুটির শিলান্যাস করেন। ২০১৭ সালের ২৭ অক্টোবর থেকে মৈত্রী সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। সেতুর কাজ শেষ হয়েছে, এখন কেবল উদ্বোধনের পালা। সেই প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন রামগড় ও সাবরুমবাসী।


Smiley face