বাংলা ভাষার ‘জান কবজ’

19
Smiley face

দেখি, সেখানে লেখাটা এমন- সরকারের এই পদক্ষেপ শিক্ষকদের ইজ্জতের উপর হামলার শামিল৷ আমি তাকে বললাম, ‘ইজ্জত’ শব্দটি বাংলায় খানিকটা ভিন্ন অর্থে, বিশেষত সম্ভ্রম অর্থে ব্যবহার হয়৷ এর বদলে ‘সম্মান’ ব্যবহার করে বাক্যটি একটু অন্যভাবে লিখি৷ তিনি নিজ শব্দপ্রয়োগে অনড় থাকলেন৷ এবার আপনারাই ভেবে দেখুন, শিক্ষকদের ‘ইজ্জত’ কি বাড়লো? আমি উদাহরণ দিলাম আরবি শব্দ ‘মদদ’-এর৷ সেটি আরবিতে ‘সাহায্য’ অর্থে ব্যবহৃত হলেও বাংলায় খানিকটা নেতিবাচক ‘ইন্ধন’ অর্থে ব্যবহার হয়৷ এতেও কাজ হলো না৷

শব্দ প্রয়োগের আগে বুঝতে হবে, শব্দ হলো ‘ইমেজ’, এটা ধারণা-বিশেষকে প্রকাশ করে৷ চাপাচাপি করলে সেই ‘ইমেজ’টা ভেঙে যায়৷ বৃষ্টিকণা আর সূর্যরশ্মির মিলনে রামধনু যেমন; কমবেশি হলেই শেষ, শব্দের ‘ইমেজ’টাও তাই৷ এই যে ‘রামধনু’ বললাম, এটাকে এখন ‘রংধনু’ বলে অনেকে৷ কিন্তু ‘রামধনু’ আর ‘রংধনু’ কি এক? ‘রামধনু’তে আছে পৌরাণিক ‘ইমেজ’, ‘রংধনু’তে শুধু রং! তফাতটা আকাশ-পাতাল৷ এসব জেনেই কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদদীন ‘রামধনু’ই ব্যবহার করেছেন, ‘রংধনু’ নয়৷ (‘রং পেলে ভাই গড়তে পারি রামধনুকের হার৷’ -জসীমউদ্দীন) প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ায় সমার্থ শব্দ জানতে ও লিখতে হয়৷ কিন্তু শব্দের সমার্থও ঠিকঠাক হয় না৷ ‘বালার্ক’ হলো ভোরের সূর্য আর ‘মার্তণ্ড’ মধ্যাহ্নের খরতাপবর্ষী সূর্য৷ বলতে পারবেন না, দুপুরের বালার্কে আপনি ঘেমে উঠেছেন৷ বললে, হবে না৷ আবার ‘সবিতা’ সকাল আটটা থেকে দশটার সূর্য; কিন্তু ‘রবি’ একটি ধারণা, যেখানে সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহ-উপগ্রহগুলো ঘুরছে৷ ফলে সমার্থ হলেও একটি শব্দের সঙ্গে অন্যটির ধারণাগত পার্থক্য ব্যাপক৷ শব্দের পরিভাষাও হয় না অনেক সময়৷ ‘সিরিয়াস’ শব্দটির কী পরিভাষা করবেন? অথবা অনুবাদ? চেষ্টা করুন, দেখবেন, এর ‘সিরিয়াসনেস’টাই থাকবে না! হাটবাজারে জিনিসপত্রের ‘দাম’ কত? সেই ‘দাম’ যে গ্রিক শব্দ, তা কজনই-বা জানি? কিন্তু লেখাপড়া না জেনেও কি ‘দাম’ শব্দটি ব্যবহার করছেন না হাজার মানুষ? ‘জিন-রি-কি-শ’ জাপানি শব্দ; এর অর্থ মানুষটানা গাড়ি৷ চীনা কিছু মানুষ সিমলাতে প্রথম গাড়িটি আনেন৷ পরে কলকাতাসহ ভারতের সর্বত্র ছেয়ে যায়৷ নাম খানিকটা বদলে হয় ‘জিন রিকশা’ থেকে ‘রিক্সা’৷ রিক্সা দিব্যি বাংলা ভাষায় এক হয়ে গেছে৷ চীনা শব্দ ‘চা’, ‘চিনি’, ফরাসি শব্দ ‘আঁতাত’, ‘রেস্তোরাঁ’, পর্তুগিজ শব্দ ‘সাবান’, ‘পাউরুটি’সহ ম্যাক্সিকান ‘চকলেট’ কিংবা অস্ট্রেলীয় আদিবাসীদের শব্দ ‘বুমেরাং’ চমৎকারভাবে মিশে গেছে বাংলায়৷ আর আরবি, পারসি শব্দের কথাতো বলাই বাহুল্য৷ আইন-আদালত থেকে হুঁশ-হুঁশিয়ার পর্যন্ত অসংখ্য আরবি-পারসি শব্দ অবলীলায় বাঙালি ব্যবহার করে চলেছে৷ কোনো প্রশ্ন জাগেনি মনে৷ ব্যবহারকালে মনে কোনো প্রশ্ন না-জাগলেই শব্দটি ভাষায় আত্তীকরণ হয়ে যায়, হয়ে যায় ভাষার সম্পদ৷ প্রশ্ন জাগলে, ব্যবহারে ধাক্কা খেলে সেটি ভাষায় ভার বাড়ায়৷ বাংলায় ‘ইজ্জত’ কিংবা ‘মদদ’ নিশ্চয়ই ব্যবহার হয়৷ কিন্তু এগুলো বাংলা ভাষায় বিশেষ ‘ইমেজ’ সৃষ্টি করে নিয়েছে, আরবির ‘ইমেজ’ থেকে যেটা আলাদা৷ এ বিষয়টি অনেকে জানেন না, অনেকে জেনেও ভাষায় জবরদস্তি করেন৷ (‘জবরদস্তি’র বদলে এখানে ‘জোর’ লিখলে হতো না৷)

বাংলায় একসময় আরবি-পারসি শব্দ স্বাভাবিকভাবেই ঢুকেছে৷ মধ্যযুগের অন্যতম সেরা কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর তো গর্ব করে বলেছেন, তিনি আরবি-পারসি শব্দ দিয়ে কবিতা লেখেন৷ রামমোহন রায় পারসি ভাষাটা এতটাই ভালো জানতেন, একটি পারসি পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব তিনি নিয়েছিলেন৷ রবীন্দ্রনাথের লেখায় ‘অনুবাদ’ শব্দের চেয়ে ‘তর্জমা’র ব্যবহার বেশি দেখা যাবে৷ প্রমথ চৌধুরী কিংবা সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, তারাও বাংলা ভাষায় আরবি-পারসি শব্দ প্রচুর ব্যবহার করেছেন৷ আদতে তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ (দেখুন, এই শব্দটির বাংলা করা যাচ্ছে না; করলে চ্যালেঞ্জটাই উবে যায়৷) ছিল সংস্কৃত ভাষার কোল থেকে বাংলাকে স্বাবলম্বী করার৷ অনেকে বলেন, ‘ব্রাহ্মণ’দের পক্ষপাত ছিল বাংলাকে সংস্কৃতঘেঁষা রাখার৷ কথাটি এভাবে বলা ঠিক নয়৷ এটি একটি মানসিকতার ব্যাপার ছিল এবং এই মানসিকতাধারীদের মধ্যে ব্রাহ্মণরাই ছিলেন বেশি৷ কিন্তু সংস্কৃতঘেঁষা রীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামটা যারা করেছেন তারাও তো ব্রাহ্মণ ছিলেন৷ রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথ চৌধুরীদের জন্মটা ব্রাহ্মণ পরিবারেই৷ তাঁরা কিন্তু সচেতনভাবে সংস্কৃত শব্দাবলি পরিহার করে অবলীলায় অসংস্কৃত শব্দ আর বিদেশি অর্থে আরবি-পারসি শব্দ বাংলায় ব্যবহার করেছেন৷ পরে কাজী নজরুল ইসলাম যেমনটা করেছিলেন৷

ভাষাকে সাবলীল রাখতে হলে শব্দের উপর খবরদারিত্ব না করাই ভালো৷ একই কালের কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত অভিধান থেকে সংস্কৃতগন্ধী শব্দ নির্বাচন করে কবিতা লিখে সমকালে খানিকটা মর্যাদা পেয়েছিলেন সত্য৷ নিজ সম্পাদিত পত্রিকায় জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে ‘প্রকাশ-অযোগ্য’ বলে ফেরত পাঠিয়েওছিলেন৷ সরল শব্দে কবিতা লিখে উত্তরকালে কিন্তু সুধীন্দ্রনাথের চেয়ে জীবনানন্দ দাশই স্মরণীয় ও শরণীয় হয়ে আছেন৷ ফররুখ আহমদের কবিতা যেন বিশেষ অর্থে সুধীন্দ্রনাথের মতো৷ একজনের সংস্কৃত, অন্যজনের আরবি-পারসি শব্দের প্রতি ঝোঁক৷ বাঙালির কাছে দুজনের কবিতার শব্দই অচেনা! কিন্তু দেখুন, আল মাহমুদ কবিতায় আরবি-পারসি শব্দ ব্যবহার করে বড় কবির সম্মান অর্জন করেছেন৷ আরবি-পারসি শব্দ ব্যবহারে ফররুখ আর আল মাহমুদের পার্থক্যটা হলো, ফররুখ অভিধান থেকে শব্দ নিয়েছেন আর আল মাহমুদ যাপিতজীবন থেকে৷ সুধীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দের পার্থক্যটা যেমন৷ আল মাহমুদ শব্দের উপর চাপাচাপি করেননি বা জবরদস্তি করে কবিতায় বসাননি৷ তাই তার কবিতায় ব্যবহৃত আরবি-পারসি শব্দগুলো বাঙালির বড় চেনা৷ সেগুলো পড়তে বা বলতে বাঁধে না৷

বাংলাদেশে শব্দের উপর রাজনৈতিক চাপটি প্রথম বোঝা যায় ১৯৪৭-এর পর৷ রাষ্ট্রীয়ভাবেই স্বাধীনতা না বলে বলা হতো ‘আজাদি’৷ এ নিয়ে অনেক লেখালেখি আছে: ‘আজাদি-উত্তর সাহিত্য’ বা ‘আজাদি-উত্তর সংস্কৃতি’ ইত্যাদি৷ বাঙালি ‘আজাদি’ নেয়নি৷ ভারতবাসী কিন্তু নিয়েছে৷ বাঙালি ‘ইনকিলাব’ নেয়নি৷ ভারতবাসী নিয়েছে৷ বাঙালির কাছে আজাদির বদলে স্বাধীনতা, ইনকিলাবের বদলে বিপ্লব, নিশানের বদলে পতাকা সাবলীলভাবে গৃহীত৷ এমন কি, সাতচল্লিশের আগে-পরে ‘আজাদ’, ‘মোহাম্মদী’, ‘ইত্তেহাদ’, ‘ইত্তেফাক’, ‘মিল্লাত’, ‘সওগাত’, ‘দিলরুবা’ নামগুলো জনপ্রিয় হলেও পরে ‘ইত্তেফাক’ ছাড়া সবগুলো পত্রিকাই হারিয়ে যায়৷ ‘ইত্তেফাক’ টিকে ছিল বঙ্গবন্ধু-ভাসানী-মানিক মিয়ার কারণে৷ গত শতকের পাঁচের দশক থেকেই ‘সমকাল’, ‘সংবাদ’, ‘কণ্ঠস্বর’, ‘পূর্বমেঘ’, ‘স্বাক্ষর’, ‘কালবেলা’ ইত্যাদি বাংলা নামে পত্রিকা বা সাময়িকী বের হয় আর জনপ্রিয়তর হয়ে ওঠে;  পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতাও পায়৷ বাংলা ভাষাকে ‘মুসলমানি বাংলা’ করার প্রক্রিয়ায় নজরুলের কবিতার ‘মহাশ্মশান’কে ‘গোরস্থান’ কিংবা জসীমউদ্দীনের কবিতা ‘নিমন্ত্রণ’কে ‘দাওয়াত’ করার প্রক্রিয়া এখন সবার জানা৷ এ সময় রবীন্দ্রনাথের হিন্দু-মুসলমান সংক্রান্ত প্রবন্ধকে সম্পাদনা করে ‘পাকিস্তান কেন’ শিরোনাম দিয়ে প্রকাশ করাও হয়েছে৷ বাংলা ভাষা শুধুই বাংলা, কেন বেশি করে সংস্কৃত নয় বা জব্বর রকমের আরবি-পারসি নয়- কিছু লোকে এই সংকটটি পরম্পরাগতভাবেই লালন করেন৷ কখনো ধর্মের নামে, কখনো রাজনৈতিক আদর্শের নামে তারা এটি চালান করেন তরুণদের মধ্যে৷ বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহিদদের স্মরণে প্রথমে কিন্তু ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ই নির্মিত হয়েছিল৷ আলাউদ্দিন আল আজাদের কবিতার নামও ‘স্মৃতিস্তম্ভ’৷ কিন্তু অল্প পরেই সেটা ‘শহিদ মিনার’ হয়ে গেল৷ এর দুটোই আরবি শব্দ, একটিও বাংলা নয়৷ এখন এটিকে আবার ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ করার চেষ্টাটাই হবে জবরদস্তি৷ সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ কিন্তু বাংলা শব্দ নিয়ে দিব্যি আছে৷ এখন ‘শহিদ মিনার’-এর দোহাই দিয়ে কেউ যদি ‘স্মৃতিসৌধ’কে ‘ইয়াদমঞ্জিল’ নামকরণের প্রস্তাব করে তাহলে তার ভেতরের ভূতটি প্রকাশ পাবে আপনা-আপনি৷

বাঙালিদের মধ্যে এই ভূতওয়ালাদের অতীতে দেখা গেছে, এখনও যায়৷ তা না হলে পাকিস্তানের স্বার্থে ‘প্রয়োজনে রবীন্দ্রনাথকেও বর্জন’ করতে চাইবেন কেন সৈয়দ আলী আহসান? তিনিই কিন্তু অনেক পরে ‘রবীন্দ্র কাব্যপাঠের ভূমিকা’ নামে চমৎকার একটি বই লিখেছিলেন৷ সৈয়দ আলী আহসানের মতো পণ্ডিতেরও আত্মদ্বন্দ্বটি কোন মাত্রায়, এ থেকে বোঝা যায়৷ তাই পণ্ডিত হলেই দ্বন্দ্বমুক্ত হবেন, এই বিশ্বাস ঠিক নয়৷ ফরহাদ মজহার ‘এরশাদ তোমাকে দেখামাত্রই গুলি করবে’ কবিতায় যে শব্দ ব্যবহার করেন, ‘এবাদতনামা : ২’-এ তা থেকে সরে যান৷ সেটাই স্বাভাবিক৷ সেখানে তিনি লেখেন: ‘না, আমি কামেল নই, নই এহ্তেকাফের বিড়াল / আমি কবি: বৃক্ষতলে চোর কিংবা বাদামভিখারি৷’ ‘এহ্তেকাফের বিড়াল’ রূপকল্পটি কবিতায় চলে৷ কিন্তু বাঙালির গদ্যভাষা বা আটপৌরে ব্যবহারে কি খাঁটে? খাঁটাতে চাইলে সেটিই হবে জবরদস্তি৷ এমন অনেক জবরদস্তি ব্যবহার নানা সময়ই দেখা যায়; পণ্ডিত বলে গণ্য তারাও করেন৷ দেয়ালে প্রতি বছর পোস্টার ছেয়ে যায় ‘জসনে জুলুসে’ লেখায়৷ কিন্তু প্রাত্যহিক ব্যবহারে এর একটু জুলুসও আসেনি৷ যারা বাংলা ভাষায় আরবি-পারসি শব্দের ব্যবহার বাড়ানোর মৃদু চাপাচাপিতে আগ্রহী, তারা কি জানেন, এর প্রতিক্রিয়ায় প্রচুর ইংরেজি শব্দ বাংলায় অনুপ্রবেশ করতে পারে? তরুণদের হাতে কিন্তু প্রচুর ইংরেজি শব্দ আছে৷ সুনামির বেগে আসতে পারে৷ তারা ভাববে, বিদেশি শব্দ যদি নিতেই হয় তাহলে ইংরেজি শব্দই নেবো; ‘স্মার্টনেস’ বাড়বে!

হিন্দি ভাষা বাণিজ্যিক কারণে আরবি-পারসি অনেক শব্দ প্রতিস্থাপন করে নিয়েছে৷ নদী যেমন দুই তীরের নানা কিছুকে ভাসিয়ে নেয় তেমন৷ রব, জিগার, ধরকন, সনম ইত্যাদি শব্দ মূল হিন্দিতে তেমন দেখা না গেলেও বাণিজ্যিক হিন্দিতে প্রচুর৷ আর ইংরেজি শব্দের কথা তো বলাই বাহুল্য৷ বাংলা হিন্দির মতো বাণিজ্যিক ব্যবহারে আসেনি৷ এর রূপটি এখনও স্বচ্ছ সরোবরের মতো; নদী নয়৷ এতে বিশেষ শব্দ ব্যবহারের জবরদস্তিতে যে ঘোলাভাব আসে তাতে ভাষাস্বচ্ছতাই ম্লান হয়৷ আমরা বাংলায় ‘জান’ও ব্যবহার করি, ‘জবান’ও ব্যবহার করি৷ কিন্তু মনে রাখা দরকার, জবরদস্তিতে ‘জান’ যেন ‘কবজ’ না হয়ে যায়, ‘জবান’ যেন ‘বন্ধ’ না-হয়৷ ‘ইজ্জত’-এর উপর হামলা হলেও জীবন থাকে; ‘জান কবজ’ হলে বাংলা ভাষা বাঁচবে কী?


Smiley face