চোরাবালি

12
Smiley face

সবনাজ মোস্তারী স্মৃতি
হিমাদ্রী মেয়েটা একেবারে পাগল টাইপের।তার ইচ্ছাগুলো,তার ভাবনাগুলো সব সময় ভিন্ন আর অদ্ভুত রকমের।লোক জন তেমন পছন্দ করে না সে।একা থাকতে খুব বেশি পছন্দ করে।তার ঘুরার জন্য বা অবসর সময় কাটানোর পছন্দের জায়গা হচ্ছে হসপিটাল,নদীর ধার।
খুব মন খারাপ হলে হসপিটালে যায়। হসপিটালের তিনতলায় গিয়ে বসে থাকে একা একা।নিজের সাথে নিজে বিরবির করে কথা বলে।
তার সব থেকে বেশি ভালো লাগে টংঘর এর চা খেতে।রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ফুচকা আর বারগার খেতে।
একা একা ঘুরে বেড়াতে তার অসম্ভব ভালো লাগে।খুব ভালো ছবিও আঁকে।তার সঙ্গী বলতে গেলে সে নিজেই।নিজেই নিজের সাথে কথা বলে। তার এমন কথা বলা দেখে অনেকে পাগলও বলে হিমাদ্রীকে।হিমাদ্রী মাঝে মাঝে চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থেকে এক দৃষ্টিতে রাস্তার যানযট দেখে। তা দেখতে নাকি তার খুব ভালো লাগে।
আজ হিমাদ্রীর ভীষণ মন খারাপ।দাড়িয়ে আছে নদীর ধারে। এখানে আসতো আরিয়ার সাথে।চরে দুইজন হাত ধরে হাটতো।দৌড়াতো,বালি দিয়ে ঘর বানাতো।পানিতে নামতো আরো কত কি।
 আরিয়া হিমাদ্রীকে কথা দিয়েছিলো প্রতি বছর নদীর চর পড়লে আরিয়া তাকে এখানে নিয়ে আসবে।
না আজ হিমাদ্রী এখানে একা এসেছে,আরিয়া আজ হিমাদ্রীর সাথে নেই।
হিমাদ্রী আরিয়াকে খুব মিস করছে বারবার ফোনটা দিতে যেয়েও দিচ্ছে না।
একটা মেসেজ লিখলো তার পর আবার ডিলিট করে দিলো। না সে আরিয়াকে কিছুতেই মেসেজ বা ফোন দিবে না। এবার আরিয়া সরি বলবে নইলে আর হিমাদ্রী কথা বলবে না।
হিমাদ্রী আর আরিয়ার সম্পর্ক হয় দুই বছর আগের।
হিমাদ্রীর এই সব পাগলামিকেই হয়তো ভালোবেসে হিমাদ্রীকে কাছে নিয়েছিলো।কিন্তু কয়েকমাস আগ থেকে আরিয়া হিমাদ্রীকে এরিয়ে চলছিলো।
হিমাদ্রীর এখন কাঁদতে খুব ইচ্ছা করছে কিন্তু সে কাঁদবে না। তাই পানির ধার ঘিসে বালির উপর হাটতে শুরু করলো।
এ হাটা যেনো কোনো উদ্দেশ্যহীন হাটা।কোনো গন্তব্য নেই।হয়তো এখন হিমাদ্রীর ইচ্ছে করছে নদী যেখানে গিয়ে সাগরে মিসেছে সেখানে যাওয়া।নদীর সাগরে মিশে যাওয়ার মত সেইও কোথাও মিশে যেতে চাই।
অন্যমনস্ক হয়ে হিমাদ্রী নদীর ধারে হেটেই চলেছে।তার যে ফোনটা ৫/৬ মিনিট ধরে বেজেই চলেছে তার কোনো খেয়াল নেই।কারণ এখন হিমাদ্রীর কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।
তবুও অনিচ্ছা স্বত্তে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে দেখে আরিয়া ফোন করেছে।হিমাদ্রী ফোনটা রিসিভ করার সাথে সাথেই আরিয়া বলে উঠলো হিমাদ্রী আর এগিয়ো না প্রিজ আর এগিয়ো না।আমি আসছি তুমি ঐখানেই দাঁড়াও।সামনে চোরাবালি আছে।
হঠাৎ হিমাদ্রীর পা দুটো মনে হলো কোনো তরল বালির মধ্যে তলিয়ে যেতে লাগলো। হিমাদ্রী চিৎকার দিয়ে বললো আরিয়া আমি চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছি ।
আরিয়া তখন কি করবে বুঝতে পারছিলো না।
হিমাদ্রী চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে। সে চোরা বালি থেকে উঠে আসতে চাইছে কিন্তু পারছে না।
হিমাদ্রী চিৎকার করছে কিন্তু কেউ আসছে না। আর আসবেও বা কেনো হিমাদ্রী আনমনা হয়ে হাটতে হাটতে এতটায় দুরে চলে এসেছে যে এদিকে কেউ আসে না।
হিমাদ্রী দেখলো আরিয়া দৌড় দিয়ে আসছে কিন্তু বালির উপর ভালো মত দৌড়াতে পারছে না।
চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে তবুও তার মনে যেনো কোনো দুঃখ নেই তার ঠোটের কোনে হাসি ফুটে উঠেছে।আরিয়ার দৌড়ে আসা দেখে হিমাদ্রীর খুব বাঁচতে ইচ্ছে করছে কিন্তু সেটা আর হলো না হিমাদ্রী তলিয়ে গেলো চোরাবালিতে।
আরিয়া বিকট চিৎকার দিয়ে বালির উপর পড়ে যায়।কারন সে তার হিমাদ্রীকে বাঁচাতে পারলো না।
আরিয়ার বাড়িতে, হিমাদ্রীর বাড়িতে ফোন দিলো। সবাই আসলো, ফায়ার ব্রিগেডের লোকেরা এসে চোরাবালি থেকে হিমাদ্রীর মরাদেহ উদ্ধার করলো। হিমাদ্রীর লাশ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। দাফন করা হলো পরের দিন।
আরিয়া কেমন যেনো পাগলের মত হয়ে গেছে।হিমাদ্রীর মৃত্যুটা এই ভাবে এত কাছে থেকে দেখে হয়তো সহ্য করতে পারেনি।সব সময় হিমাদ্রীর দেওয়া চিঠিগুলো,উপহারগুলো নিয়ে বসে থাকে আর বিরবির করে বলে হিমাদ্রী আসবে।
দেখতে দেখতে প্রায় এক বছর হয়ে গেছে।আরিয়া কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে।তাই আজ আরিয়া নদীর ধারে গেছে কারন আজতো হিমাদ্রীর জন্মদিন।হিমাদ্রী আরিয়াকে সব সময় বলতো তার ইচ্ছে তার জন্মদিনটা নদীর ধারে খোলা আকাশের নিচে পালন করবে। আজ হিমাদ্রী নেই কিন্তু আরিয়া হিমাদ্রীর জন্মদিনটা একা পলন করছে নদীর ধারে একটা কেক, কিছু বেলুন নিয়ে। আরিয়া একা বসে হিমাদ্রীর কথা ভাবছে।
হঠাৎ কেউ একজন পিছন থেকে এসে আরিয়া বলে ডাক দিলো।
আরিয়া পিছন ফিরে দেখে হিমাদ্রী। আরিয়া খুব অবাক হয়ে বলে হিমাদ্রী তুমি!বলেই হিমাদ্রীর হাত ধরতে যায় কিন্তু পারে না। আরিয়ার সামনে হিমাদ্রী দাঁড়িয়ে আছে ঠিকি কিন্তু কেমন যেনো ধোয়াশা। ধোয়া যেমন আমরা ধরার চেষ্টা করলেও পারি না ঠিক তেমনটা।
হিমাদ্রী আরিয়াকে বলে আরিয়া তুমি কখনো মন খারাপ করবে না। আমার জন্য কোনো পাগলামি করবে না। আমি তো তোমারি আছি। আর ঐ তারা দেশে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
আরিয়া তুমি কিন্তু খুব লক্ষি ছেলে হয়ে থাকবে।আর আমি জানতাম আজ তুমি এখানে আসবে।
ভালো থেকো আরিয়া। আমাকে এবার যেতে হবে। সময় নেই আর।
আরিয়া হিমাদ্রীকে বলে প্রিজ যেও না হিমাদ্রী তোমাকে ছাড়া থাকতে আমার খুব কষ্টো হয়।
হিমাদ্রী বলে আমাকে যে যেতেই হবে এখন।তবে প্রতি বছর এই দিনে আমি এখানে আসবো তোমার সাথে দেখা করতে।
আরিয়া হিমাদ্রীর দিকে তাঁকিয়ে বলে সত্যি আসবে তো?
হিমাদ্রী বলল হুম আসবো। তারপর কোথায় যেনো মিলিয়ে গেলো হিমাদ্রী।
আরিয়া অপেক্ষা করতে লাগলো আবার একটা বছরের জন্য।কবে আবার এ দিন আসবে।
সমাপ্ত

Smiley face