বায়ুমণ্ডলীয় কার্বণ ডাই অক্সাইড(CO2) এর পরিমান প্রথমবারের মত ৪২০পিপিএম

25
Smiley face

“আমাদের অবশ্যই কিছু করতে হবে”: বায়ুমণ্ডলীয় কার্বণ ডাই অক্সাইড এর পরিমান প্রথমবারের মত ৪২০ পিপিএম অতিক্রম করেছে। বিশ্ব উষ্ণায়নে প্রধান দায়ী গ্যাসটির বায়ু মন্ডলে ক্রমবর্ধমান ঘনত্ব বৃদ্ধির বিষয়ে গ্রেটা থানবার্গ বলেছে, “এটি সত্যিই সাড়া জাগানো হতাশা এবং আমি এটি একটি ভাল বিষয় বলতে চাই না।”

প্রশান্ত মহাসাগরীয় হাওয়াই দ্বীপপপুঞ্জের বড় দ্বীপে স্থাপিত বায়ু মন্ডলীয় গ্যাস পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র মাওনা লোয়া (Mauna Loa Observatory ) কর্তৃক গৃহিত একটি পরিমাপ অনুযায়ী এপ্রিল ০৩, ২০২১ তারিখে রেকর্ড করা তথ্যে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বায়ুমণ্ডলীয় কার্বন ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব ৪২০ পিপিএম অতিক্রম করেছে।

ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, যখন ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড এটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA) গবেষণা কেন্দ্র “১৯৫০ এর দশকের শেষের দিকে CO2 এর পরিমাপ সংগ্রহ শুরু করে, তখন বায়ুমণ্ডলীয় CO2 এর ঘনত্ব প্রায় ৩১৫ পিপিএম ছিল। আর এপ্রিল ০৩, ২০২১ তারিখ শনিবার CO2 এর দৈনিক গড় ঘনত্ব ছিল ৪২১.২১ পিপিএম – যা মানব ইতিহাসে এ প্রথম এত বেশি ঘনত্ব ছিল।

জলবায়ু কর্মী গ্রেটা থানবার্গ CO2 স্তরের NOAA এর সাম্প্রতিকতম তথ্যের বিজ্ঞপ্তিতে উষ্মা প্রকাশ করে বলেছেন, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে CO2 এর পরিমাপ ৪২০ পিপিএমের প্রথমবারের নথিভুক্ত গ্রহণকে “সত্যিকারের সাড়া জাগানো বাজে রেকর্ড হিসাবে বর্ণনা করেছেন”।

উষ্ণয়ণ বৃদ্ধির দায়ী গ্যাসের ঘনত্ব ৪২০ পিপিএম ছাড়িয়ে যাওয়ায় তিনি বলেন, “গ্রহটির মানব-প্ররোচিত উষ্ণায়নের এক বিস্ময়কর মাইলফলক, যা প্রাক শিল্প বিল্পব (১৭৫০ এর পূর্ব) স্তর হতে COস্তর দ্বিগুণ হওয়ার পথের অর্ধেক পথ।”

CO2 এর পরিমাপ ৪১৬ পিপিএমের ঘনত্বে পৌঁছানোর এবং ছাড়িয়ে যাওয়ার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে – যার অর্থ আমরা প্রাক শিল্প যুগের COস্তর প্রায় ২৭৮ পিপিএম এবং সে চিত্রের দ্বিগুণ বা ৫৫৬ পিপিএম এর মধ্যবর্তী অবস্থানটি পেরিয়েছি।

এপ্রিল ০৩, ২০২১ তারিখ শনিবারে পৌঁছে যাওয়া CO2 এর ৪২১ পিপিএমের রেকর্ডটি কেবল একটি একক পয়েন্ট এবং CO2 এর স্তর উহার বার্ষিক শীর্ষ স্তরে পৌঁছে যাওয়ার কারণে ঘটেছে। তবে গত দু’মাস ধরে ৪১৭ পিপিএম-এরও বেশি স্তরগুললো ইঙ্গিত দেয় যে বার্ষিক গড় ঘনত্ব সম্ভবত ৪১৬ পিপিএম ছাড়িয়ে যাবে।

যদিও বায়ুমণ্ডলীয় CO2-এর ক্রমবর্ধমান ঘনত্ব যা বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে যা জীবাশ্ম জ্বালানী চালিত পুঁজিবাদের উত্থানের সাথে সামঞ্জস্য, এটি ১৯৭০ এর দশক থেকে বিশেষত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

স্টটিতে বলা হয়েছে যে বায়ুমণ্ডলীয় CO2 দ্বিগুণ হওয়ার ফলে প্রাক শিল্প বিপ্লব সময়ের পূর্ব তাপমাত্রা গড়ের তুলনায় পৃথিবীর তাপমাত্রা ২.৬ থেকে ৪.১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বৃদ্ধি পাবে। ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রার একটি স্তর পরিবর্তিত হবে যা সামান্য তাপমাত্রার বৃদ্ধিতে আরও মারাত্বক হয়ে উঠবে।

পোস্টটিতে আরও বলা হয়েছে, “গ্রিনহাউস গ্যাস (CO2, CH₄, N2O, O3, CFCs, etc.) এর নির্গমন যদি রাতারাতি হ্রাস পায়ও, তারপরও আগামী কয়েক বছর ধরে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।

কারণ, ক্যালিফোর্নিয়ায় ব্রেকথ্রু ইনস্টিটিউটের জলবায়ু বিজ্ঞানী জেক হাউসফাদার সংবাদপত্রকে বলেছেন,”শিল্প বিপ্লবের কারণে এ পৃথিবীতে যে পরিমাণ কার্বণ নির্গমন হয়েছে তার ফলস্বরূপ বিশ্ব আজ উষ্ণায়নের মুখোমুখি হচ্ছে, এটা এ নয় যে বিগত বছরের কার্বণ নির্গমনের জন্য এ বছর উষ্ণয়ন বৃদ্ধি পেয়েছে।”

পোস্টটির রিপোর্ট অনুসারে COই কেবলমাত্র উদ্বেগজনক প্রবণতায় বৃদ্ধি পাচ্ছে না, আন্যান্য গ্রীণ হাউজ গ্যাসের বৃদ্ধিও উদ্বেগজনক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মিথেন এবং সালফার হেক্সাফ্লোরাইডের নির্গমনও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

যদিও CO2 মত মিথেন (CH4) বায়ুমণ্ডলে অবস্থান করে না, তবে এটি তাপকে আরও কার্যকরভাবে শোষণ করে, যার অর্থ এটি জলবায়ু সংকটকে ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তুলছে। পরিবেশগত প্রতিরক্ষা তহবিল (Environmental Defense Fund- EDF) এর তথ্য অনুসারে, মিথেন বায়ু মন্ডলে নির্গমণের পরের দুই দশকে CO2 এর চেয়ে ৮৪ গুণ বেশি শক্তিশালী থাকে অর্থাৎ ১ পিপিএম মিথেণ নির্গমণ মানে ৮৪ পি্পিএম CO2 নির্গমণের সমান।

CFCs এর অন্তর্ভূক্ত সালফার হেক্সাফ্লোরাইডের কথাই বলি না কেন, এটি একটি গ্রীণ হাউজ গ্যাস যা “বৈদ্যুতিক গ্রিডে ব্যবহৃত ইনসুলেটরগুলো হতে উৎপন্ন হয় এবং বর্তমানে বায়ু মন্ডলে এর পরিমান ১০ PPT (Parts Per Trilion) তে পৌঁছেছে যা সর্বকালের রেকর্ডে।

অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের তুলনায় বায়ু মন্ডলে এর ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি মাত্রায় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ২০০৩ সালের পর থেকে বায়ুমণ্ডলে এর বৃদ্ধির হার দ্বিগুণ হয়েছে।

সালফার হেক্সাফ্লোরাইডও CO2 হতে বহুগুণ বেশি শক্তিশালী – একটি একক অণু CO2 এর অণুর চেয়ে এটি ২৩৯০০ গুণ বেশি উষ্ণতা সৃষ্টি করতে পারে এবং সালফার হেক্সাফ্লোরাইডের একটি একক অণু বায়ুমন্ডলে প্রায় তিন সহস্রাব্দ বছর অপরিবর্তিত অবস্থায় টিকে থাকতে পারে।

প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে একবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে বার্ষিক গড় বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক শিল্প বিপ্লব সময়ের পূর্ব তাপমাত্রা গড়ের উপরে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখার অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়েছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা গত বছর সতর্ক করেছে যে, বিশ্বে ২০২৪ সালের মধ্যে কমপক্ষে এক বছরে উষ্ণতার মাত্রা উহার ২০% ছাড়িয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।

ডিসেম্বর, ২০২০ এ জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, “বিজ্ঞান পরিষ্কার। বিশ্ব এখন থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিবছর জীবাশ্ম জ্বালানী উৎপাদন ৬% করে হ্রাস না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। আরও খারাপ।”

বন পরিবেশবিদ জর্জিও মাত্তিউসি এপ্রিল ০৫, ২০২১ তারিখে টুইট করেছেন, “আমাদের কিছু একটা করতে হবে!”


Smiley face